গল্প

গল্প 07

ঊনিশ শো তেতাল্লিশ চুয়াল্লিশ বলে মনে হয়

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

                                                                                                                                                     
গল্প 06

পথে, প্রদেশে
মাসুদ খান

বাংলা প্রাণের দেশ, বাংলা গানের দেশ, মায়া ও প্রেমের দেশ, বাংলা যেন এক জাদুবাস্তবের দেশৃ
যে দেশে উজান বেয়ে চলে, প্রেমে, ভাটির ভাসান
স্রেফ ভালোবাসাবাসি দিয়ে যেইদেশে বহু মুশকিল আসান!
যে দেশে সুজন দেখে করলে প্রেম, মরলেও বাঁচাতে পারে তারে
সত্যি-সত্যিই, এবং বারে বারে!
অরূপ রূপের সেই দেশে উড়ে চলো মন
ঘুরে ঘুরে বেড়াই এ-মনপবনের জাদু-উড়াননৌকায়
দূর-দূরান্তের নানা জেলায় জেলায়ৃ
অরূপ রূপের সেই দেশের ছোট্ট একটি জাদুবাস্তব শহর বগুড়া  যেখানে কেবলই মিলে-মিলে যায় রোদ ও কুয়াশা, মিলে-মিলে যেতে চায় স্বপ্ন ও বাস্তব। একাকার হতে চায় প্রাপ্তি আর বাসনাৃসম্ভব-অসম্ভবের দোলাচলে টালমাটাল দাঁড়িয়ে থাকে বগুড়ার ল্যান্ডস্কেপ, এর পথঘাট, বাহন-বিপনী, আড়ত-ইমারত! এখানকার মানুষ ও কবিকুল হাঁটেন স্বপ্নসম্ভব পথে। ঘুরে বেড়ান কুয়াশাসম্ভব মাঠে ও প্রান্তরে! অবাক-করা এক শহর! বেশ কিছুকাল আমিও ছিলাম সেই স্বপ্নশহরে। এক অর্থে বগুড়া আমারও শহরৃআসলে প্রত্যেকেরই থাকে একটি করে শহর, মনের মতো, স্বপ্নময় শহর  যেখানে উপশহরের আধো-আলো-আঁধারি-জড়ানো কোনো বিষাদমাখা বারান্দা থেকে দেখতে পাওয়া যায় শহরের কোনো নার্সিং হোমের শুশ্র“ষাময় আলোৃ।
সেই স্বপ্নশহরে আমার, আমাদের যাপন ও উদ্যাপনের আলো-আঁধার দিয়ে রচিত এই সন্ধ্যাভাষ্য।
* * *
জিন্সের প্যান্ট। নীল টি-শার্ট। শার্টের পিছনে লেখা ‘অ্যান্ড মাইল্স টু গো বিফোর আই স্লিপৃঅ্যান্ড মাইলস্ টু গো বিফোর আই স্লিপৃ’। শার্টে কুয়াশা। নীলচে-নীলচে। প্যান্টে কুয়াশা। কাঁধ বেয়ে নেমে আসা লম্বা-লম্বা চুল। চুলেও কুয়াশা। এই হালকা-হালকা শীতের গোধূলিবেলায় ধীরপায়ে হেঁটে চলেছে ওই যে এক কিশোর কবি। নিরুদ্দেশ পথিকের মতো। নির্জন গোহাইল রোড ধরে হেঁটে যাচ্ছে দক্ষিণে। ঘুমিয়ে পড়বার আগ-পর্যন্ত কবিকে পেরুতে হবে মাইল-মাইল পথ। কবি বায়েজিদ মাহবুব। মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকি তার ওই মাথানিচু হেঁটে যাওয়া, অনেকদূর পর্যন্ত। একসময় আস্তে-আস্তে মিলিয়ে যান কবি আরো অধিক কুয়াশার ভেতর।
এক বিখ্যাত তরুণ, বজলুল করিম বাহার, কবি, চিরসবুজের চিরবসন্তের দেশ থেকে আসা অজর অক্ষর ঝলমলে বসন্তবাহার! রাগ মিয়া-কি-মল্লার, রাগ অনন্ত-ভাটিয়ারৃপা-থেকে-মাথা-পর্যন্ত কবি, নখ-থেকে-লিঙ্গ-পর্যন্ত কবি  বিস্ময়কর এক তরুণৃমানুষের চোখেমুখে যে এত আলো ও বিজলিচমকানি থাকে, থাকতে পারেৃমানুষ যে কখনো কখনো এতটা শিশু আর এতটা কবি হয়ে ওঠে, উঠতে পারে  আমরা দেখিনি কখনোৃআর তার সেই বিখ্যাত শৈশববোঁধ  শৈশবে, জ্যোৎ­ারাতে, দূর ভুটানের পাহাড় থেকে স্বপ্নের মতো নেমে আসত সব নীলগাই। নেমে আসত বাঘ, বাঘদাস (ডিম পাড়ে হাঁসে/ খায় বাঘদাসে) আর ভুটান মূলুকের ভুটিয়ারা। দলে দলে। এই ধানজুড়ি, এই কইগাড়ি, এই বৃন্দাবনপাড়া, এই দত্তবাড়ি, এই নামাজগড়, মালতিনগরৃআর আমরা সত্যি-সত্যি একদিন দেখলাম, ম্যান্ডোলিন-এর দোতলায় দাঁড়িয়ে, লাফিয়ে ওঠার ভঙ্গিতে একদম ফ্রিজ করে দেওয়া সেই তীরবিদ্ধ পাথরিত ঘোড়ার পায়ের নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, বাহার, ফখরুল-পাগলা, শিবলী, আদিত্য, পাগলা-রাইসু আর আমিৃ(আমি আর আমার বউ তখন কবি ব্রাত্য রাইসুকে প্রীতিবশত কখনো পাগলা-রাইসু কখনো রাইসু-পাগলা বলতাম, সামনে নয় আড়ালে! আর ফখরুলকে তো পাড়াসুদ্ধ সবাই পাগলা কবিই বলত! তো সেই সময় কবি সাজ্জাদ শরিফ, রাজু আলাউদ্দিন, ব্রাত্য রাইসু, আদিত্য কবির এঁরা ক-দিনের জন্য বেড়াতে এসেছিল আমাদের সেই বৃন্দাবনের বাড়িতে, আদিত্য তো এসেছিল সারাপথ নাঙ্গা পায়ে, গিয়েছিলও তাই) তো আমরা সত্যি-সত্যিই দেখলাম, রাত দশটা বাজতে না বাজতেই উডবার্ন লাইব্রেরির পার্ক থেকে বেরিয়ে গোহাইল রোড ধরে আসছে চকচকে সব ডোরাকাটা বাঘ, সাতমাথার দিকে। একটা, দুইটা, তারও পরে আরো একটা, হুঙ্কার ছাড়তে ছাড়তে। আর পেছনে পেছনে সত্যিই একটা বাঘদাস, একটা নয় ঠিক, দুইটা। সাতমাথার সেই ছোট্ট গোল আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে এক বেরসিক ট্রফিক পুলিশ তার নির্বিকার হাতের সংকেতে থামিয়ে দিচ্ছে তাদের। আর বাঘ ও বাঘদাসগুলোও সব কেমন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে পড়ছে সুশীল বালকের মতো। অবাক কাণ্ড!
সপ্তপদী। কেউ বলে, সাতমাথা। সাতটা পথ এসে মিশেছে এখানে। ছোট্ট গোল ট্রফিক আইল্যান্ড। ফুলছড়ি ঘাট থেকে ট্রেন এসে থেমেছে বগুড়া স্টেশনে। যাত্রীরা আসছে খরগোশের মতো ব্যস্তসমস্ত হয়ে রিকশায়, পায়ে হেঁটেৃ। শহরের বাসগুলো ট্রাকগুলো সারাদিন কোথায়-কোথায় দৌঁড়ে বেড়িয়েছে ঊর্ধ্বশ্বাসে। এখন সব বাড়ি ফিরছে নিরীহ কিশোরের মতো নানা দিক থেকে, নানা দেশ থেকে। সাতমাথা আর রেলস্টেশনের মাঝামাঝি জায়গাটায় তাদের আস্তানা। বাহার ভাই বলছেন, অনেকটা প্রফেটিক ভঙ্গিতে, দেখবেন, বাঘগুলা যেই সাতমাথা পার হয়ে এদিকটায় আসবে, অমনি বদলে গিয়ে হয়ে যাবে একেকটা নতুন-নতুন ট্রাক। দেখবেন তা-ই হবে। আর কী অবাক কাণ্ড! সত্যি-সত্যি শহরের এই নতুন অংশের দিকে আসতে আসতে রূপান্তর হচ্ছে বাঘদের! বাঘের চোখ দুটো বদলে যাচ্ছে একজোড়া জ্বলজ্বলে হেডলাইটে। ধেয়ে চলা পা-চারটি ওই যে আস্তে-আস্তে গোলাকার হয়ে বদলে যাচ্ছে চাকায়! হুঙ্কার রূপান্তরিত হচ্ছে হর্নের আওয়াজে। আর বাঘের ডোরাকাটা তেলচকচকে শরীর হয়ে যাচ্ছে ট্রাকের পেইন্ট-করা স্ট্রাইপ-অলা চকচকে বডি। শহরের এই নতুন অংশের চোখধাঁধানো আলো পিছলে পড়ছে বডি থেকে।
আজ রাতে বাহার ভাই যা-যা বলছেন, ঠিক তা-ই তা-ই হচ্ছে। নেকড়েমতো একটা প্রাণী, লম্বামুখো, হুসহুস করে ছুটে আসছে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে, শেরপুর রোড ধরে। সাতমাথার ওই গোলচত্বর পার হয়ে এসেই হয়ে যাচ্ছে টেম্পো। হুড়–ৎ করে দ্রুত বাঁক নিয়ে চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দিকে, নিজস্ব ডেরায়।
আপনি যদি কখনো বগুড়ায় আসেন, দেখবেন, এখানে এরকমই হয়।
চম্পক। গার্ডেন রেস্তোরাঁ। আলোজ্বলা গোল-গোল ছাতার নিচে গোল-গোল টেবিল। নানান বাহারি গাছ। ফুলগাছ। শহরের সব আলো নিভে যাবার পর সেখানে আপন তেজেই আলোকিত হয়ে থাকে উদ্ভিদগুলো। আজ তারা সেজেছে খুব করে। খোঁপা করেছে, নানা রকমের বাহারি খোঁপা-টপনট, পনি টেইলৃকানে পরেছে দুল, ঝুমকা, রূপলঙ্কাৃ।
সপ্তপদী থেকে আকবরিয়া মার্কেট, সারাক্ষণ উৎসব-উৎসব আমেজ। রাস্তার দুধারে ভিখারি বণিতা কবি প্রেমিক উন্মাদ ফলবিক্রেতা ওষুধবিক্রেতা গন্ধবণিক রেস্তোরাঁ প্রেক্ষাগৃহ, হরেক রঙের প্রথা, রিচুয়াল, নানান যজ্ঞ লেগেই আছে। মহাধুমধাম।
একজন লোক। খুবসম্ভব কোনো ওষুধ কোম্পানির সেল্স্ রিপ্রেজেনটেটিভ। নতুন এসেছেন এ শহরে। হয়তো দূরের কোনো শহর থেকে। হাতে ব্যাগ। সন্ধ্যার পর শ্যামলী-তে আহার সেরে বাইরে এসে আরাম করে পান চিবাচ্ছেন। তাম্বুলরসে রঞ্জিত তার মন ও মুখ। চোখেমুখে ফুর্তি-ফুর্তি ভাব। লম্বা জাহাজের মতো এক সিনেমা হল। উত্তরা হল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী বালকের মতো সিনেমার বড় বড় পোস্টার দেখছেন। দেখছেন তাকিয়ে তাকিয়ে চারদিক। হাসি-হাসি মুখ। যেন সর্ব-অঙ্গ দিয়ে বোঁধ করছেন পুলক ও পবিত্রতা। আমাদের শিবলী, কবি শিবলী মোকতাদির, হঠাৎ কোত্থেকে এসে জানা-নাই-শোনা-নাই আচমকা কী-কী যেন বলছে লোকটাকে, মিটিমিটি হেসে হেসে  জানেন, জানেন, খবর শুনছেন, নানান দেশ থেকে, গাইবান্ধা সিলেট রংপুর রাজশাহী বগুড়া বাঁকুড়া ব্রেমেন বাস্তিল বীরভূম থেকে সব কবি-সাহিত্যিকরা আইসা বলা-নাই-কওয়া-নাই পথিকের বাসায় উঠতেছে। আরে পথিক মানেৃচিনলেন না! ওই যে, কামরুল হুদা পথিক, গল্পকার পথিক, গল্পকার চিনলেন না? গল্প করে যেৃগল্পকারৃউপপদ তৎপুরুষ, আরে তৎপুরুষ বুঝলেন না? তাহার পুরুষৃতৎপুরুষ, ষষ্ঠী তৎপুরুষৃ যাঃ শালার তৎপুরুষ তো দেখতেছি নিজেই এক তৎপুরুষ সমাস! আসলে কী জানেন, বাংলা এক আজব ভাষা, এক মজার ভাষাৃএই ধরেন সমাস, ধরেন-ধরেন, ধরেন না! ৃধরছেন তো! ‘দুই গু-য়ের সমাহার’ৃবলেন তো কী? আহ্হা! পারলেন নাৃ(আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে বাজিয়ে গুনগুন করে গাইতে থাকে) ‘উল্লুকেরও থাকিতে নয়নৃ’ এটুকু গাওয়ামাত্র লোকটা বেশ ঘাবড়ে যায়, ভাবে, তাকেই বোঁধহয় উল্লুক বলছেৃতো শিবলী গাইতে গাইতেই ইশারায় লোকটাকে আশ্বস্ত করে, বলে, ‘না-না আপনাকে না, এটা তো গান, এমনি-এমনিই গাই আর কি!’ বলেই ফের শুরু করে দেয়  “উল্লুকেরও থাকিতে নয়ন/ না দ্যাখে সে রবিরও কিরণ/ কী কবো দুঃখেরো কথাৃ সে-জন ভাব জানে না-হা/ সে-জন মানিক চেনে না/ যে-জন প্রেমের ভাব জানে না, তার সাথে নাই লেনা-দেনা/ খাঁটি সোনা ছাড়িয়া যে নেয় নকল সোনা, সে-জন সোনা চেনে না// ’ এতখানি গাইবার পরও তার ওপর লোকটার পুরাপুরি একিন আসে নাই দেখে শিবলী আরেকটা গান শুরু করে  “তোর নামের ভরসা ক‘রে তরী দিলাম ছেড়েৃ/ একবার হাইল ধরিয়া বইসো গুরু ভাঙা তরীর ’পরে রে/ অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রেৃ” তো, দুই গু-য়ের সমাহারৃদ্বিগুৃআচ্ছা দ্যাখেন তো কী কীর্তি! দ্বিগু নিজেই দ্বিগু সমাসৃ হাঃ হাঃ হাঃ কী তামশা!ৃআবার দ্যাখেন, কর্মধারয়ৃব্যাসবাক্য কী?ৃ কর্ম যে ধারয়ৃ কর্মধারয়ৃ (ঠিক হইতেছে তো!)ৃ হাহ্, কর্মধারয় নিজেই এক কর্মধারয়ৃ আবার ধরেন বহুব্রীহিৃবহু ব্রীহি আছে যাহারৃনিজেই বহুব্রীহি সমাসৃ! আবার দ্যাখেন, অব্যয়-অব্যয় ভাবৃঅব্যয়ীভাব! আর যেন কী আছে? তৎপুরুষ। ও হোৃতৎপুরুষ তো আগেই বললাম। তো দেখলেন তো, কী তামশা! সব ফকফকা! আর যেন কী! ও, দ্বন্দ্বৃদ্বন্দ্ব সমাসৃএইবার দ্বন্দ্বে এসে পড়লাম তো বেশ ধন্দে! “মোরে কূলে রাইখা বারেবার/ না যাইও গাঙ্গেতে আর// সাথে সাথে নিয়ো তুমি নৌকাতে/ নাও বাইয়ো না মাঝি বিষম দইরাতে// কলোকলো ছলোছলো নদী করে টলোমলো/ ঢেউ ভাঙে ঝড়-তুফানে রেৃ/ নাও বাইয়ো না মাঝি বিষম দইরাতে//” তো যা বলতেছিলাম, সেই পথিক, গল্পকার পথিক, লিটল ম্যাগ স¤পাদক পথিক। ইদানীং খালি সায়েন্স ফিকশন ছাপাইতে চায় তার লিটল ম্যাগেৃখালি বলে সাই-ফিক, সাই-ফিকৃ অবশ্য কবিতাও ছাপাইবৃতো, তার বাসাটা তো এক্কেরে থইথই করতেছে, একদম ভর্তি দেশি-বিদেশী কবিসাহিত্যিক দিয়া! মাটির মসজিদের পাশে বাসা। জানেন, চা বানাতে বানাতে ভাবি একেবারে হিমশিম খাইতেছে! (ফের দুলে-দুলে গাইতে থাকেৃ) “পিরিত যতন, পিরিত রতন, পিরিত গলার হার/ পিরিত কাঞ্চন পাইল যে-জন, পিরিত কাঞ্চন পাইল যে-জন, সফল জনম তারো রে/ দুনিয়া পিরিতের বাজার//।” শেষে শুধু গান আর গানেরই জোয়ারৃ লোকটাও গুনগুন করে তাল দিতে থাকে আস্তে আস্তে –
“ক্যালন মাছের ত্যালন-ত্যালন, তেইল্যা মাছের গোসা/ নতুন মাইয়ার বুড়া জামাই, নতুন মাইয়ার বুড়া জামাই/ নিত্যই করে গোস্সা গো/ দুনিয়া পিরিতের বাজারৃ// (ফেরৃ) কই মজে কইয়ের ত্যালে, মাগুর মজে ঝোলে/ রসিক মরে প্রেমের জ্বালায়, রসিক মরে প্রেমের জ্বালায়/ ফড়িং মরে ফান্দে গো// রঙ্গের নাও রঙ্গের বৈঠাৃ/”
আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, শিবলী অনর্গল বলে যাচ্ছে আর তুড়ি বাজাতে বাজাতে গুনগুন করে গাইছে, আর অচেনা লোকটা শিশুর বিস্ময় ও কৌতূহল নিয়ে সব শুনছেন। কোনো অপ্রস্তুত ভাব নেই। খুব খুশিখুশি লাগছে তাকে।
লোকটার কাছে সবকিছু অপূর্ব-অপূর্ব লাগছে! ওই জাহাজের মতো লম্বা সিনেমা হল  তার সাতরঙা পোস্টার, সাতরঙা হোর্ডিং, অচেনা এক শিবলীর কাছ থেকে আচমকা অপ্রত্যাশিত সব তথ্যপ্রাপ্তি, স-ব, সবকিছুৃ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন, শুনছেন, আর মিটিমিটি হাসছেন।
আকবরিয়া মার্কেট। পড়–য়া। বইয়ের দোকান। কবি শোয়েব শাহরিয়ারের। সন্ধ্যা হয়ে আসছে তখন। শহরের নানান জায়গা থেকে তরুণ কবিরা, ছোট কাগজের স¤পাদকেরা, কবি-যশোপ্রার্থীরা ধীরে ধীরে এসে জড়ো হচ্ছে পড়–য়া-র সামনে। আড্ডা হচ্ছে তুমূল, কখনো পড়–য়া-র সামনে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই, কখনো শ্যামলী-তে, কখনো আকবরিয়া-য়, কখনো এশিয়া-য়, মিষ্টির দোকানে, মিষ্টি খুব পছন্দ কবিদের, কখনোবা তৃষা-য়। আকবরিয়া এলাকাটা যেন শহরের হৃৎপিণ্ড, এই ছোট্ট স্বপ্নসম্ভব শহরের! আ স্মল বিউটিফুল হার্ট দ্যাট অলওয়েজ থ্রব্স্!
বৃহস্পতিবার। ওই যে এক দীর্ঘকায় ছিপছিপে তরুণ। কবি মাহমুদ হোসেন পিন্টু। কী এক অচেনা নেশায়, অজানা আকর্ষণে তিব্বতি ছোরার মতো দুধারে বাতাস কেটে কেটে হনহন করে হেঁটে আসছে পড়–য়া-র সান্ধ্য আড্ডার দিকে। যেন একরকম ছুটেই আসছে! কাঠের আসবাবের দোকান তাদের। বনানী ফার্নিসার্স। এখন সন্ধ্যা বৃহ¯পতিবারের। কাল বন্ধ। কাল ছুটি। পড়–য়া-র বাঁশির সুর কানে এসে বাজছে, মন একেবারে উন্মন হয়ে আছে! প্রাণ পিপাসিত হয়ে আছে ওই সান্ধ্য আড্ডার জন্য। “তরল্লা বাঁশেরো বাঁশি ছিদ্র গোটা ছয়/ বাঁশি কতই কথা কয়/ আমার নাম ধরিয়া বাজায় বাঁশি রহনো না যায়/ প্রাণসখী রে, ওই শোন কদম্বতলায় বংশী বাজায় কে//” সন্ধ্যা হয়ে আসছে আর তার সেই কাঠের ছোট্ট অরণ্যে, বিচিত্র সাইজ-করা সব কাষ্ঠখণ্ডে, বার্ণীশবিহীন অসমাপ্ত আসবাবের কাঠামোতে গজিয়ে উঠছে ঝলমলে পাতা ও পল্লব। প্রাণ পাগল হয়ে যায়! সন্ধ্যায় তড়িঘড়ি শ্রমিকদের সপ্তাহের পাওনা মিটিয়ে দিয়ে, হিসাবণিকাশ সেরেই দে ছুটৃ।
আরো একজন। বিপরীত দিক থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছেন পড়–য়া-র দিকে। সরকার আশরাফ। কথাকার। নিসর্গ-র সম্পাদক। চেহারাটা বেশ রাফ অ্যান্ড টাফ। প্রেস থেকে এলেন। পায়ে ধুলা, চুলেও ধুলা উড়ছে। লিটল ম্যাগাজিন তার ধ্যান, জ্ঞান, সাধনাৃ।
কবি ফখরুল আহসানের সঙ্গে রিকশায় চলেছি। রিকশা চলছে তো চলছেই, তন্দ্রাচ্ছন্ন, মদালস। দুপুরের রোদের ভেতর দিয়ে ঘুরে ঘুরে ঠনঠনিয়া, কানছগাড়ি, মালতিনগর, জলেশ্বরীতলাৃ। রাস্তার ধারে এক ছোকরা নাপিত টুল ও চেয়ার পেতে, আয়না খাটিয়ে বসে পড়েছে দিব্যি। টেকোমাথা এক খদ্দের। মাথায় অল্প কিছু চুল অবশিষ্ট। টাক থেকে প্রতিফলিত হচ্ছে আলো। চকচকে করছে তাই। নাপিত ছোকরা খুব কায়দা করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চুল ছেঁটে দিচ্ছে। খালি গায়ে নেয়াপাতি ভুড়ি ভাসিয়ে আয়েশে চোখ বুজে চেয়ারে বসে আছেন টেকোমাথা। কী মজা! কী আমোদ আকাশে বাতাসে ও রোদে! কী আনন্দ আলোর বিদ্যুচ্চুম্বক ঢেউয়ে, ফড়িঙের পাখার কাঁপনে, লাউডগার লিকলিকে জিহ্বায়, আকর্ষিকায়, বাতাসের গুলতানিতে! শ্র“তি ছুঁয়ে যাচ্ছে শ্র“তি, হৃদিতে মিশছে হৃদি, শ্রবণে শ্রবণৃ। এই তো হচ্ছে যোগাযোগ, একদম সরাসরি, সোজা ও সহজ! নাপিতের পাশে রাখা রেডিওতে গান বাজছে। গানের ঝলক বেতার থেকে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে তারে। ইলেকট্রিকের তার। তারে প্রতিহত হয়ে কানে এসে লাগছে গানের সুর, ফুটে উঠছে কলি “নদীর নাম সই অঞ্জনা, নাচে তীরে খঞ্জনা, সই, আমি যাব না আর জল আনিতে, ওই-না নদীরও ঘাটে, পখি তো নয় নাচে কালো আঁখিৃ।”
রিকশা চলছে। চলছে তো চলছেই, তন্দ্রাচ্ছন্ন, মদালস।
মফিজ পাগলার মোড়। সাঁৎ করে একটি রিকশা আড়াআড়ি পার হয়ে গেল। আরোহী দুজন তরুণী। চালকের চোখেমুখে স্ফূর্তি, অনির্বচনীয়। গলা ছেড়ে গাইতে গাইতে যাচ্ছে, ওই সেই একই গান “নদীর নাম সই অঞ্জনা, নাচে তীরে খঞ্জনা, সই, আমি যাব না আর জল আনিতে, ওই-না নদীরও ঘাটে, পখি তো নয় নাচে কালো আঁখিৃ।”
জলেশ্বরীতলা। পথের পাশে ছোট্ট একটি মুদিদোকান। দোকানিটা খুব সরল-সোজা। অনেক কজন খরিদ্দার এসেছে দোকানে। দোকানি একটু হিমশিম খাচ্ছে হয়তো-বা। বিরক্ত-বিরক্ত ভাব। একপর্যায়ে সে সবাইকে অবাক করে দিয়ে, যেন এক তুড়িতে বিশ্বের তাবৎ বাণিজ্যনীতির গালে চটকনা মেরে বলে উঠল, “আর কারো দোকান দ্যাখো-না, খালি আমার দোকানে আইসা ভিড় করো!” রিকশায় এক চক্কর দিয়ে যখন আবার যাচ্ছিলাম সেই দোকানের সামনে দিয়ে, দেখলাম এক আশ্চর্য ব্যাপার, বিরসবদন ওই লোকটিই কিনা দোকানদারি ছেড়ে বাইরে এসে কাঁধে একটি শিশুকে তুলে নেচে নেচে গাইছে, অবাক, সেই একই গান “নদীর নাম সই অঞ্জনা, নাচে তীরে খঞ্জনা, সই, আমি যাব না আর জল আনিতে, ওই-না নদীরও ঘাটে, পখি তো নয় নাচে কালো আঁখিৃ।”
রিকশা চলছে। চলছে তো চলছেই, তন্দ্রাচ্ছন্ন, মদালস। বর্ষাশেষের উদাস-উদাস দুপুর। পাশে শীর্ণকায়া করতোয়া। নিচু ভল্যুমে মাইক বাজিয়ে উজান বেয়ে চলেছে পালতোলা একটি নৌকা, বনভোজে যাচ্ছে বোঁধহয়। কিন্তু বন কই? মাইক তো কখনো এত নিচু স্বরে বাজে না! যা হোক তবুও পাল উড়ছে, নৌকা চলছে, মাইক বাজছেৃ ভেসে আসছে সেই একই গান, একই কলি ‘‘নদীর নাম সই অঞ্জনাৃ”। কিন্তু নদীর নাম তো করতোয়া, তীরে খঞ্জনা পাখির জোড়া হয়তো এখনো নাচে কিন্তু জল নিতে আসা কাউকে দেখলাম না, যে কিনা সইদের বলবে, “পাখি তো আর কিছু রাখিবে না বাকিৃ”।
একজন বৃদ্ধমতো মানুষ। অবসরে যাওয়া শিক্ষক হয়তো-বা। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। নাতিকে নিয়ে এসেছেন মাছ ধরতে। বড়শি ফেলে বসে আছেন সিরিয়াস ভঙ্গিতে। স্মিতমুখ নাতি দাদুকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে। দাদু কিছু তার জবাব দিচ্ছেন, কিছু দিচ্ছেন না। বড়শিতে মাছ ধরছেন  চেলা, নলা, পুঁটি, টেংরা, বউমাছৃ। মাছ ধরে ধরে পেছনে রাখছেন বিছিয়ে রাখা গামছায়। ফাৎনার দিকে নিরঙ্কুশ মনোযোগ দাদু ও নাতির। এদিকে তিনটি টিট্টিভ পাখি পেছন থেকে এসে একটি একটি করে মাছ মুখে পুরে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। গিলে ফেলছে টপাটপ। কিন্তু টেংরাকে তারা বাগে আনতে পারেছে না কিছুতেই।
মাছ তো সব খেয়ে গেল টিট্টিভে। নাতির চোখ ছলোছলো। পায়জামার ধুলো ঝেড়ে দাদু ও নাতি উঠে এবার হেঁটে যাচ্ছে নদীর কিনার ধরে। হাত নেড়ে নেড়ে দাদু নাতিকে কী কী যেন বলছেন, বোঝাচ্ছেন। হয়তো ধৈর্যধারণের কথা, হয়তো আগামী স্বপ্নের কথাৃ আগামীকালে, আরো আরো আগামীকালে তারা আবারও বসবে ছিপ ফেলে, অসীম ধীবরধৈর্যে, আর অনেক অনেক মাছ পাবে তারা, বড়শিতে।
সম্পাদক, প্রাবন্ধিক, কবি ফারুক সিদ্দিকী। পাকাচুল, কিন্তু নিরলস। টানা চল্লিশ বছর ধরে বিপ্রতীক বের করছেন। নবীন কবিরা মজা করে বলে ‘বীরপ্রতীক’। তাঁর বাড়ির নাম “কে-লজ”। সূত্রাপুর, বগুড়া। বিশাল জায়গা জুড়ে অদ্ভুত এক বাড়ি। স্পিলবার্গের ছবির শ্যুটিং লোকেশনের যেন এক অতীত সংস্করণ।
আগে সূত্রাপুর, মালতিনগর, জলেশ্বরীতলা, মফিজ পাগলার মোড়  পুরো এলাকাটা ছিল জঙ্গলে ভরা। প্রাণবৈচিত্র্যে উপচানো। বাহার ভাই যে বলেন সাতমাথার দিকে বাঘ আসত, বাঘদাস আসত, নীলগাই নামত, তা তো আসত এই ফারুক ভাইয়ের পরগণা থেকে। হঠাৎ-হঠাৎ ফারুক ভাই বাঘ আর বাঘদাস পাঠাতেন আর বাহার ভাই কেবলই বিস্মিত হতেন আর জীবজানোয়ারদের যাতায়াত কন্ট্রোল করতে হিমশিম খেতো ট্রাফিক পুলিশ।
ফারুক ভাইয়ের পরগণায় এখন আর বাঘ নাই, বাঘদাসও নাই। অরণ্যও নাই। পরিষ্কার। কালে কালে গজিয়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, জেগে উঠেছে পাকা রাস্তা। তবে তাঁর হাবেলি যেখানটায়, শুধু ওই জায়গাটুকুতে কিছুটা অরণ্য এখনো অক্ষুণœ রয়েছে। ইটকাঠলোহাপাথরের বিশাল মরুভূমির মধ্যে ছোট্ট একটি মরূদ্যান। কালের চাবুকে পাতা ঝরে, প্রাণ-প্রাণী-প্রকৃতীতে ধস নামে, অতঃপর বৃক্ষের বীজ থেকে, প্রাণী ও মানুষের বীজ থেকে ফের গজিয়ে ওঠে নতুন অঙ্কুর, নতুন পাতা, নতুন পাখি, নতুন প্রাণ, নতুন মানুষ। যে বৃদ্ধা বাঘিনী জরা ও অনশনে জীর্ণা হতে হতে অরণ্যের ওই যে ওখানে নেতিয়ে পড়ে মরে গিয়েছিল, ঠিক ওখানটাতেই পড়ে আছে সে। লোমণ্ডলাবণ্য সব উবে গেছে হাওয়ায়, চামড়া-মাংস সব পচে ধুয়ে ফুরিয়ে গেছে একেবারে, এখন মাটির ওপর জেগে আছে শুধু হাড়ের কাঠামো। অবিকৃতপ্রায়। ময়লা জমেছে, শ্যাওলা ধরেছে মাত্র।
ফারুক ভাইয়ের বনে বিচিত্র গাছগাছালি। হঠাৎ একটি খেজুর গাছ। গুনা দিয়ে মাটির কলসি বেঁধে লাগানো হয়েছিল গাছে। পরে গাছিয়াল লোকটির কী জানি কী মনে হয়েছিল, কোনোদিন আর কলসি নামাতে যায়নি সে। কলসিতে রস জমেছে, উপচে পড়েছে, শুকিয়ে গেছে, পিঁপড়ায় বোলতায় খেয়েছে। তারপর মাটির মৌচাকের মতো ছোট ছোট টিবি গড়েছে বোলতারা ঝুলন্ত ওই কলসির ওপরেই।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার হয়েছে বোলতাদের। টিবি ঝরে গিয়ে গজিয়েছে নতুন ঢিবি, ওই কলসিরই গায়ে। যে-সময় গাছটি কলসি বেঁধে নিয়েছিল গলায়, সে-সময় সে ছিল তরুণ। পরে কলসিকে অনেকদূর পেছনে ফেলে বেড়ে উঠেছিল তরতরিয়ে। আরো পরে বাজ পড়েছিল মাথায় একদিন। বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয়েছিল গাছটির। মরেও দাঁড়িয়ে আছে সটান। সারা গায়ে কাঠঠোকরার খোঁড়ল। আর তরুণ বয়সের গলায়-বাঁধা কলসি এখন কোমরে। লোহার সরু গুনাটি পর্যন্ত শুকিয়ে মড়মড়ে হয়ে গেছে।
আমরা  মানে ফারুক ভাই, বাহার ভাই, কথাকার সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ, সরকার আশরাফ, কামরুল হুদা পথিক, রোহন রহমান, কবি মঈন চৌধুরী, শোয়েব শাহরিয়ার, সাজ্জাদ শরিফ, রাজু আলাউদ্দিন, ব্রাত্য রাইসু, আদিত্য কবির, আবদুল্লাহ ইকবাল, শেখ ফিরোজ, ফখরুল আহসান, মাহমুদ হোসেন, সৈয়দ মাহবুব, শামীম কবীর, বায়েজিদ মাহবুব, শিবলী মোকতাদির, আশিক সারোয়ার, আমি  সে-এক বিশাল অভিযাত্রীবাহিনী, ঢুকে পড়লাম সেই অরণ্যের ভিতর। মনে হলো অন্তত আশি বছর কোনো জনমানুষের পা পড়েনি এখানে। আশি বছরের অগেকার সময় তার গন্ধ হাওয়া স্মৃতি আমেজ উষ্ণতা নিয়ে জড়িয়ে ধরল আমাদের। এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি! সময় যেন থমকে রয়েছে, আবার ঠিক থমকেও নেই। আসলে এখানে, অন্তত এই জায়গাটুকুতে, সময় বইছে এক ভিন্ন চালে। নির্বিঘেœ, আপনমনে। একটুও ডিসটার্ব করেনি কেউ কখনো এখানকার কোনোপ্রকার স্থিতি, গতি বা প্রবাহকে। এই তো কিছুক্ষণ আগে কে যেন এসে আমাদের উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তাদের টাইম মেশিনে, অল্প কতক্ষণ ঘুরিয়ে নামিয়ে দিয়ে গেছে এখানে। আর তাতেই পার হয়ে গেছে আশিটি বছর
(চলবে)

পথে, প্রদেশে (মাসুদ খান) পর্ব এক

পথে, প্রদেশে (মাসুদ খান) পর্ব দ্বিতীয়

                                                                                                                                                                   
গল্প 05

গল্প: কী যে ভালবাসি

শ্যামার বাসায় ফিরতে আজ দেরী হচ্ছে। কলেজ ছুটি হওয়ার কথা সেই তিনটায়। অথচ সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। শ্যামা ফিরছেনা। মা শিউলী বেশ উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে। ভুলে আজ মোবাইলটাও নেয়নি শ্যামা। তাতে কি, অন্যকারো মোবাইল থেকেওতো দেরী হওয়ার কারণটা জানাতে পারতো মাকে। বান্ধবীদের কারো মোবাইল নাম্বারও নেই মায়ের কাছে। শ্যামা সাধারণত: এতটা দেরী করে না। তাছাড়া বান্ধবীদের বাসা বা অন্য কোথাও গেলে মাকে অবশ্যই জানিয়ে যায়। তাছাড়া কলেজের বাইরে কোথাও যাওয়াটা মা একদম পছন্দ করেন না শ্যামাও তা জানে। মা একবার বাইরে যাচ্ছেন আবার ভেতরে প্রবেশ করছেন। অস্থির হয়ে পায়চারী করছেন সেই কখন থেকে। এমন সময় কলিং বেল বেজে ওঠে। মা দ্রুত গিয়ে দরজা খোলে। শ্যামাকে দেখামাত্র দেরী হওয়ার কারণটা জানার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে শিউলী। শ্যামা তাতে বিরক্ত প্রকাশ করে। মাকে বলে, মা তেমন কিছুই হয়নি। আমাকে একটু ফ্রেস হতে দাও। তারপর বলছি।
শ্যামা কলেজ ড্রেস ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়। গিয়ে বারান্দায় বসে। শিউলীর যেন তর সইছে না। শিউলী বলল, এবার বল মা কোথায় গিয়েছিলি? কেন দেরী হয়েছে।
– সত্যি সত্যি বলবো মা।
– হ্যাঁ, সত্যি করে বল।
– তুমি আবার রাগ করবেনাতো?
– আহ, আগে বলতো দেখি।
শিউলী মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। তারপর বলল, আজ আমাদের শেষের দু’টি ক্লাস হয়নি মা। তাই আমরা দুই বান্ধবী মিলে রমনা পার্কে বেড়াতে গিয়েছিলাম। কয়েকদিন আগে পার্কে একটি লোক আমাদের ফলো করেছিল। আমরা যেদিকে যাই সেদিকেই যাচ্ছিল।
শিউলী চমকে ওঠে।
– বলিস কি? কোন সমস্যা করেনিতো?
– আহ, তুমি আগে ঘটনাটা শোনে নাও। তারপর লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি আমাদের ফলো করছেন কেন?
শিউলী আবারো চমকে ওঠে। বলল, বলিস কি তুই লোকটার সাথে কথা বলেছিস?
– বলবনা। লোকটা আমাদের কেন ফলো করছে তা জানতে হবে না?
– তারপর?
– তারপর লোকটি বললো আমাকে নাকি তার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। আমাকে নাকি তার খুব কাছের কোন একজন বলে মনে হচ্ছিল। সেই লোকটির সঙ্গে আজ আবার ঠিক একই জায়গায় আমাদের দেখা হয়েছে। লোকটি তার জীবনের অনেক কথা আমাদের বলেছে। আমাদের আজ চাইনিজও খাইয়েছে। কাল আবার দেখা করতে বলেছে।
শিউলী এবার অনেকটা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। বলল, ভণ্ড। মস্ত বড় ভণ্ড। এসব করে তোর সাথে ভাব জমাতে চাচ্ছে। তোকে না বলেছি কোনদিন কোন পুরুষ মানুষের সঙ্গে মিশবিনা।
– লোকটি আমার বাবার বয়সী মা।
– পুরুষ মানুষের বয়স বলে কিছু নেই। এই বয়সের পুরুষগুলো আরো বেশি খারাপ হয়।
শ্যামা আর কিছুই বলে না। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে। শ্যামা যখন একটু একটু বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই মায়ের পুরুষ বিদ্বেষী এই মনোভাবটা দেখে আসছে। শ্যামাকেও কোন ছেলের সঙ্গে কথা বলতে দেখলে যেন মায়ের মাথা খারাপ হয়ে যায়। এমনকি তার বাবাকেও সহ্য করতে পারেনি মা। যে কারণে বাবার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। শ্যামার তখন সাত বছর। বাবা তার মাকে বলেছিল, তোমার আমার সম্পর্কটা অনেকটা যন্ত্রের মতো। এভাবে জীবনটাকে আর কতটা টেনে নিয়ে যবো। উত্তরে মা বলেছিল, আমার কিছুই করার নেই। মৃত্যুপথযাত্রী বাবার ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে তোমাকে বিয়ে করেছি। তোমার কাছে আমি একটা যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নই। কারণ, আমার মনটা অন্য একজনকে দিয়ে দিয়েছি। মনতো একজনকেই দেয়া যায়। তারপর মা তার বাবাকে ডিভোর্স দিয়ে শ্যামাকে নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। মা আর তার বাবার বাড়িতেও ফিরে যায়নি। একটি স্কুলে শিক্ষকতা করে শ্যামাকে নিয়েই এতটা বছর কাটিয়ে দিয়েছে। শ্যামা পরে জানতে পেরেছে মায়ের সঙ্গে আলাদা হওয়ার কিছুদিন পরেই তার বাবাও মারা যান। অথচ বাবার কোন দোষ ছিল না। বাবা অস্বাভাবিক ভালবাসতো মাকে। মা কেবল অবহেলাই করেছেন বাবাকে। কিন্তু কেন? কেন বাবার প্রতি এতটা অবহেলা ছিল মায়ের? কেন পৃথিবীর সব পুরুষের প্রতি এতটা বিদ্বেষ, এতটা অবহেলা? শ্যামা এই প্রশ্নের উত্তর অনেকবার জানতে চেয়েছে মায়ের কাছে। কিন্তু মা কখনো এই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। বরং বিভিন্নভাবে এড়িয়ে গেছেন। মাকে সেই একই প্রশ্ন বার বার করতে তার ইচ্ছে হচ্ছিল না। শিউলী শ্যামাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুই আমাকে একটা কথা দে মা। তুই কখনো আর পার্কে যাবি না। ঐ লোকটার সাথে আর দেখা করবিনা।
শ্যামা তাকায় মায়ের দিকে। শিউলীর দু‘চোখে তখন পানি জমে ওঠেছে। মাকে দেখে শ্যামার বেশ মায়া হলো। বলল, ঠিক আছে মা। তোমার কথার অবাঁধ্য হবো না।
শিউলী শ্যামাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে। শ্যামাও ছোট্ট শিশুর মতো মায়ের বুকের সঙ্গে মিশে থাকে। শ্যামা মায়ের বুকের ভেতর এক ধরনের উত্তাপ অনুভব করে। শ্যামার ধারণা এই উত্তাপই যেন পুরুষের প্রতি মায়ের এত ঘৃণার কারণ। বুক থেকে মাথা তুলে মায়ের চোখের দিকে তাকায় শ্যামা। বলল, তোমার কাছে সেই কথাটি আবারো জানতে ইচ্ছে করছে মা।
– কোন কথাটি? মা প্রশ্ন করেন।
– ছেলেদের প্রতি তোমার এত অবিশ্বাস আর ঘৃণা কেন? যে কারণে বাবাকেও সহ্য করতে পারোনি?
শিউলী চুপ করে থাকে। শ্যামাকে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ায়। বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরে তাকায়। শ্যামাও মায়ের পেছনে দাঁড়ায়। হাত রাখে মায়ের কাঁধে। তারপর আবার প্রশ্ন করে, মা আজ আর চুপ করে থেকোনা। আমাকে আজ বলতেই হবে।
শিউলী ফিরে তাকায় শ্যামার দিকে। বলল, তুই বড় হয়েছিস। তোর বাবার প্রতি আমার অবহেলার কারণটা তোকে না বললে যে সারাজিবন আমি তোর কাছে অপরাধী হয়ে থাকবো।
– হ্যাঁ মা, বলো।
শিউলী বলতে শুরু করে।
-আমি যখন কলেজে পড়ি তখন আমার ক্লাসেরই একটি ছেলেকে ভালবেসেছিলাম। এমন ভালবাসা যে একজন আরেকজনকে একদিন না দেখেই থাকতে পারতাম না। আমাদের লেখাপড়া শেষ হলো। তারপর বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হলো তার পরিবারের কাছে। তার বাবা ছিল ঢাকার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। গুলশানে রাজ প্রাসাদের মতো নিজের বাড়ি ছিল তাদের। আর আমি তোর বড় মামার বাসায় থেকে লেখাপড়া করতাম। তোর মামা ছিলেন একটি কোম্পানির দাঁড়োয়ান। তারা খোঁজ নিয়ে যখন জানতে পারলো তখন তার বাবা-মা আমাকে বিয়ে করাতে রাজি হলোনা। ছেলেটি আমাকে কোন কিছু না বলেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। আর খুঁজে পেলাম না তাকে। কিন্তু তাকে আমি কতটা যে ভালবাসতাম তোকে বোঝাতে পারবনা। সেই থেকে সব ছেলেদের প্রতি আমার বিশ্বাস হারিয়ে গেল। তাই তোকে কোন ছেলের সঙ্গে মিশতে দেখলে আমার ভয় হয়। যদি তোর জীবনেও এমন কোন ঘটনা ঘটে।
কথাগুলো এক নাগারে বলতে বলতে শিউলীর দু‘চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। মায়ের চোখের পানি দেখে শ্যামাও আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলো না। দু’হাতে চোখের পানি মোছে মাকে বলল, সত্যিই তোমার জীবনটা অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। গল্পের শেষটুকুতো তুমি জানো না মা। শিউলী অবাক হয়। জিজ্ঞেস করলো, তার মানে?
– হ্যাঁ মা। তারপর সেই ছেলেটি বাবা-মায়ের অবাঁধ্য হয়ে তোমাকে বিয়ে করলো না। কিন্তু তোমার প্রতি যেন তার ভালবাসা নষ্ট না হয় সেজন্য অন্য কাউকে বিয়ে না করে বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেল আমেরিকায়। এই নিয়ে সে তিনবার দেশে এসেছে। দেশে এসে তোমার অনেক খোঁজ করেছে। যে ক’দিন দেশে থেকেছে প্রতিদিন রমনা পার্কের যেখানে তোমরা গল্প করতে সে জায়গাটিতে বসে থাকতো। তোমার কথা ভাবতো। সেই স্মৃতিগুলো তার চোখের সামনে ভেসে ওঠতো। এতেই সে সুখ পেতো। কারণ, তার মনের মধ্যে তুমি সেই আগের মতোই আছো। সেখানে আর অন্য কাউকে স্থান দেয়নি।
শিউলী শোনে আর অবাক হয়। শিউলী যেন ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরে গেল। তারপর অস্থির হয়ে বলল, তুই কি করে জানলি। বল, আমাকে। তুই কার কাছে শোনেছিস এসব কথা। আমাকে বল শ্যামা, আমাকে বল।
শ্যামা বলল, পার্কে পরিচয় হওয়া সেই লোকটির কাছে। তার বলা গল্পের সঙ্গে তোমার গল্প হুবহু মিলে গেছে।
কথাটা বলে শ্যামা দৌড়ে তার রুমে প্রবেশ করে। ব্যাগ থেকে একটি ছবি বের করে আবার আসে মায়ের কাছে। বলল, এই দেখো মা সেই লোকটির ছবি।
শিউলী ছবিটি হাতে নিয়ে দৃষ্টি আর ফেরাতে পারে না ছবিটির উপর থেকে। মুখভর্তি কাঁচাপাকা দাঁড়ি। কিন্তু চিনতে কোন অসুবিধা হয়নি। চোখ দু’টি সেই আগের মতোই আছে। যে চোখের দিকে তাকিয়ে শিউলী তার গভিড়ে হারিয়ে যেত। যে চোখের দিকে তাকিয়ে মনের ভাষা পড়ে ফেলতে পারতো শিউলী। মনের অজান্তেই যেন চোখের পানিতে ছবিটি ভিজে যাচ্ছিল। শিউলী তাকায় শ্যামার দিকে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, এই লোকটির কাছে আমাকে নিয়ে যাবি শ্যামা।
শ্যামা বলল, তা বোঁধহয় আর সম্ভব নয়। এতক্ষণে তার বিমান হয়তবা আকাশে উড়াল দিয়েছে। তিনি আজ চলে যাচ্ছেন। আর কখনো দেশে আসবেন না বলে আমাকে জানিয়ে গেছেন। আচ্ছা মা তুমি কি এখনো লোকটিকে ভালবাস?
শিউলী হু হু করে কাঁদতে থাকে। চোখের জলে তার বুক ভেসে যাচ্ছে। ছবিটিকে গভিড় ভালবাসায় বুকের সঙ্গে চেপে ধরে রেখেছে। বলল, তাকে এখনো কী যে ভালবাসি আমি কি করে বোঝাব।
শিউলী কেবল কাঁদতেই থাকে।
গল্প: কী যে ভালবাসি

পর্ব 3 এখানে

                                                                                                                                                                     
গল্প 04
।। ভীড়ের মাঝে একা ।।

জানুয়ারী’১১, মেয়েটি সকালে মা’র বকা খেয়ে চোখ কচলে উঠে বসলো। “মা, তুমি না বড্ড বেরসিক। একটু ঘুমুতেও দাও না’’ মা মুচকি হেসে নাস্তা আনতে গেলেন। একচোখ খোলা অবস্থায় সে FACEBOOK এ LOG IN করল। INBOX এ ১টি মেসেজ, ‘hello’। অদ্ভুত নামের এক ছেলের TEXT। উত্তর না দিয়ে sign out করল। রাতে আবার মেসেজ ‘এত attitude?’ মেসেজ এর জবাব না দিয়ে পারা গেল না। এভাবেই পরিচয়।

একের পর এক মেসেজ। বন্ধুত্বটা গাঢ় হল। ছেলেটি মেয়েটিকে একসময় ভালবেসে ফেললো। মেয়েটি ভীষন পাজি। বুঝেও বুঝতে চায় না। এক সপ্তাহ পর ছেলেটি বলল, ‘দেখা করবে?’ মেয়েটি রাজি। দুষ্টুমি করা যাবে খুব করে।

‘RIFFELS SQUARE’ এর সামনে একটি PILLAR এ হেলান দিয়ে মেয়েটি দাড়িয়ে। অপেক্ষা করতে একটুও ভালো লাগে না তার। একের পর এক TEXT ‘কোথায় তুমি’… ‘তোমার পাশে, তোমায় দেখছি’। আচমকা ঘুরে দাড়ালো মেয়েটি, অসম্ভব সুন্দর হাসি নিয়ে ছেলেটি দাড়িয়ে। সব দুষ্টুমি যেন লজ্জায় মোড় নিল। কথায় কথায় ছেলেটি বলে ফেলল ‘তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি। ফিরিয়ে দিবে নাতো?’ মেয়েটি সময় চাইলো। অনেক ভেবে কিছুদিন পর মেয়েটি হ্যাঁ বলল।

সব ঠিকঠাক ছিল। সবাই বলত ‘BEST COUPLE’। মেয়েটি ছেলেটিকে এক সময় এত ভালোবেসে ফেলে যে তার সাথে থাকতে SCHOLARSHIP DROP করে দিলো। মাঝে মাঝে কথা…রাত জেগে গল্প…একজন অন্যজন কে SUPPORT করা…দিনগুলো স্বপ্নের মত কেটে যেত। প্রতিটি দেখা ছিল নতুন আনন্দের সূচনা। প্রতিবারই যেন নতুন করে দেখা।

পহেলা বৈশাখ…ছেলেটি বলল… ‘শাড়ি পরে আসবে।তোমার জন্য SURPRISE আছে’। দেখা হল। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ একটি আংটি বের করে মেয়েটিকে হতভম্ভ করে দিল। আংটি পরিয়ে মেয়েটিকে একতোড়া রক্তলাল গোলাপ দিয়ে বলল ‘তোমার খুব পছন্দের,তাই না?’ রূপকথাও যেন এতটা আনন্দের নয়। বন্ধুরা অবাক বনে যেত তাদের দেখে…এতটা ভালো বোঝাপড়া ছিল!!

‘অন্ধকারকে খুব ভয় পাই আমি’ মেয়েটি বলল। ‘চিন্তা করো আমি আছি’। ‘অত উঁচুতে উঠলে তো পড়ে যাব’… ‘পড়বে না, তোমায় ধরে আছি’ ছেলেটি বলল। মেয়েটিও তার সব কথা বিশ্বাস করতো।

কিন্তু ৪মাস পরে ছেলেটা অনেক বদলে গেছে। একটু্তে রাগ, ঝগড়া আবার ঠিকও হয়ে যায়। কাণ্ণা হাসি নিয়া দিন যায়। ৭মাস পরে ছেলেটা হঠাৎ বলল ‘আমি এই RELATION সামলাতে পারছিনা। আমায় একা থাকতে দাও’। মেয়েটা যে এমনটি আশা করেনি। তার পুরো জীবন যে এখন ছেলেটিকে নিয়ে। তার কান্নার ভাবান্তর হয় না ছেলেটির মাঝে। কিছুদিন পরে মেয়েটি জানতে পারে যে ছেলেটি তার পুরোনো GIRLFRIEND এর সাথে যোগাযোগ করে। ছেলেটি বুঝতে পারে না কাকে সে চায়। তারপর একদিন মেয়েটাকে বলে ‘আমাদের BREAK UP করা উচিৎ’। কিছুদিন চেষ্টা করে মেয়েটা বুঝে, সবই ছেলেটার মোহ। ভেঙ্গে যায় সম্পর্কটি। আজ ৪টি মাস হল। মেয়েটি কিন্তু আজ়ও তাকে ভালবাসে। আজও বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদে। কেউ সে কান্না দেখে না। রক্তলাল গোলাপগুলো এখন সে ঘৃণা করে, কারণ গোলাপগুলো যে তাকে বড্ড বেশি কাঁদায়..আজ আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারেনা। ভীড়ের মাঝে আজও একা সে।

হ্যাঁ……মেয়েটি আমি।

                                                                                                                                                              

গল্প 03

বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ভাল্লুক। পথের পাশে গাভী জাবর কাটছে শুয়ে শুয়ে। দু’হাতের পেশি ফুলিয়ে গাভীকে দেখিয়ে ভালুক বললো দেখ, আমি আর্নল্ড্ শোয়াসনেগার!
গাভী তাকিয়ে দেখলো, কিন্তু র্নিবিকার। ভালুকটি আরো পেশি ফুলিয়ে বললো, আরো বাবা, ভাল করে তাকিয়ে দেখ, আমি আর্নল্ড্ শোয়াসনেগার!
উঠে দাঁড়ালো গাভীটি। তারপর লেজ দিয়ে নিজের ভরাট স্তন স্পর্শ করে ভালকুকে দেখিয়ে বললো:
– দেখ, আমি পামেলা এন্ডারসন

শ্যামার বাসায় ফিরতে আজ দেরী হচ্ছে। কলেজ ছুটি হওয়ার কথা সেই তিনটায়। অথচ সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। শ্যামা ফিরছেনা। মা শিউলী বেশ উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে। ভুলে আজ মোবাইলটাও নেয়নি শ্যামা। তাতে কি, অন্যকারো মোবাইল থেকেওতো দেরী হওয়ার কারণটা জানাতে পারতো মাকে। বান্ধবীদের কারো মোবাইল নাম্বারও নেই মায়ের কাছে। শ্যামা সাধারণত: এতটা দেরী করে না। তাছাড়া বান্ধবীদের বাসা বা অন্য কোথাও গেলে মাকে অবশ্যই জানিয়ে যায়। তাছাড়া কলেজের বাইরে কোথাও যাওয়াটা মা একদম পছন্দ করেন না শ্যামাও তা জানে। মা একবার বাইরে যাচ্ছেন আবার ভেতরে প্রবেশ করছেন। অস্থির হয়ে পায়চারী করছেন সেই কখন থেকে। এমন সময় কলিং বেল বেজে ওঠে। মা দ্রুত গিয়ে দরজা খোলে। শ্যামাকে দেখামাত্র দেরী হওয়ার কারণটা জানার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে শিউলী। শ্যামা তাতে বিরক্ত প্রকাশ করে। মাকে বলে, মা তেমন কিছুই হয়নি। আমাকে একটু ফ্রেস হতে দাও। তারপর বলছি।
শ্যামা কলেজ ড্রেস ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়। গিয়ে বারান্দায় বসে। শিউলীর যেন তর সইছে না। শিউলী বলল, এবার বল মা কোথায় গিয়েছিলি? কেন দেরী হয়েছে।
– সত্যি সত্যি বলবো মা।
– হ্যাঁ, সত্যি করে বল।
– তুমি আবার রাগ করবেনাতো?
– আহ, আগে বলতো দেখি।
শিউলী মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। তারপর বলল, আজ আমাদের শেষের দু’টি ক্লাস হয়নি মা। তাই আমরা দুই বান্ধবী মিলে রমনা পার্কে বেড়াতে গিয়েছিলাম। কয়েকদিন আগে পার্কে একটি লোক আমাদের ফলো করেছিল। আমরা যেদিকে যাই সেদিকেই যাচ্ছিল।
শিউলী চমকে ওঠে।
– বলিস কি? কোন সমস্যা করেনিতো?
– আহ, তুমি আগে ঘটনাটা শোনে নাও। তারপর লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি আমাদের ফলো করছেন কেন?
শিউলী আবারো চমকে ওঠে। বলল, বলিস কি তুই লোকটার সাথে কথা বলেছিস?
– বলবনা। লোকটা আমাদের কেন ফলো করছে তা জানতে হবে না?
– তারপর?
– তারপর লোকটি বললো আমাকে নাকি তার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। আমাকে নাকি তার খুব কাছের কোন একজন বলে মনে হচ্ছিল। সেই লোকটির সঙ্গে আজ আবার ঠিক একই জায়গায় আমাদের দেখা হয়েছে। লোকটি তার জীবনের অনেক কথা আমাদের বলেছে। আমাদের আজ চাইনিজও খাইয়েছে। কাল আবার দেখা করতে বলেছে।
শিউলী এবার অনেকটা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। বলল, ভণ্ড। মস্ত বড় ভণ্ড। এসব করে তোর সাথে ভাব জমাতে চাচ্ছে। তোকে না বলেছি কোনদিন কোন পুরুষ মানুষের সঙ্গে মিশবিনা।
– লোকটি আমার বাবার বয়সী মা।
– পুরুষ মানুষের বয়স বলে কিছু নেই। এই বয়সের পুরুষগুলো আরো বেশি খারাপ হয়।
শ্যামা আর কিছুই বলে না। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে। শ্যামা যখন একটু একটু বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই মায়ের পুরুষ বিদ্বেষী এই মনোভাবটা দেখে আসছে। শ্যামাকেও কোন ছেলের সঙ্গে কথা বলতে দেখলে যেন মায়ের মাথা খারাপ হয়ে যায়। এমনকি তার বাবাকেও সহ্য করতে পারেনি মা। যে কারণে বাবার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। শ্যামার তখন সাত বছর। বাবা তার মাকে বলেছিল, তোমার আমার সম্পর্কটা অনেকটা যন্ত্রের মতো। এভাবে জীবনটাকে আর কতটা টেনে নিয়ে যবো। উত্তরে মা বলেছিল, আমার কিছুই করার নেই। মৃত্যুপথযাত্রী বাবার ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে তোমাকে বিয়ে করেছি। তোমার কাছে আমি একটা যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নই। কারণ, আমার মনটা অন্য একজনকে দিয়ে দিয়েছি। মনতো একজনকেই দেয়া যায়। তারপর মা তার বাবাকে ডিভোর্স দিয়ে শ্যামাকে নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। মা আর তার বাবার বাড়িতেও ফিরে যায়নি। একটি স্কুলে শিক্ষকতা করে শ্যামাকে নিয়েই এতটা বছর কাটিয়ে দিয়েছে। শ্যামা পরে জানতে পেরেছে মায়ের সঙ্গে আলাদা হওয়ার কিছুদিন পরেই তার বাবাও মারা যান। অথচ বাবার কোন দোষ ছিল না। বাবা অস্বাভাবিক ভালবাসতো মাকে। মা কেবল অবহেলাই করেছেন বাবাকে। কিন্তু কেন? কেন বাবার প্রতি এতটা অবহেলা ছিল মায়ের? কেন পৃথিবীর সব পুরুষের প্রতি এতটা বিদ্বেষ, এতটা অবহেলা? শ্যামা এই প্রশ্নের উত্তর অনেকবার জানতে চেয়েছে মায়ের কাছে। কিন্তু মা কখনো এই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। বরং বিভিন্নভাবে এড়িয়ে গেছেন। মাকে সেই একই প্রশ্ন বার বার করতে তার ইচ্ছে হচ্ছিল না। শিউলী শ্যামাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুই আমাকে একটা কথা দে মা। তুই কখনো আর পার্কে যাবি না। ঐ লোকটার সাথে আর দেখা করবিনা।
শ্যামা তাকায় মায়ের দিকে। শিউলীর দু‘চোখে তখন পানি জমে ওঠেছে। মাকে দেখে শ্যামার বেশ মায়া হলো। বলল, ঠিক আছে মা। তোমার কথার অবাঁধ্য হবো না।
শিউলী শ্যামাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে। শ্যামাও ছোট্ট শিশুর মতো মায়ের বুকের সঙ্গে মিশে থাকে। শ্যামা মায়ের বুকের ভেতর এক ধরনের উত্তাপ অনুভব করে। শ্যামার ধারণা এই উত্তাপই যেন পুরুষের প্রতি মায়ের এত ঘৃণার কারণ। বুক থেকে মাথা তুলে মায়ের চোখের দিকে তাকায় শ্যামা। বলল, তোমার কাছে সেই কথাটি আবারো জানতে ইচ্ছে করছে মা।
– কোন কথাটি? মা প্রশ্ন করেন।
– ছেলেদের প্রতি তোমার এত অবিশ্বাস আর ঘৃণা কেন? যে কারণে বাবাকেও সহ্য করতে পারোনি?
শিউলী চুপ করে থাকে। শ্যামাকে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ায়। বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরে তাকায়। শ্যামাও মায়ের পেছনে দাঁড়ায়। হাত রাখে মায়ের কাঁধে। তারপর আবার প্রশ্ন করে, মা আজ আর চুপ করে থেকোনা। আমাকে আজ বলতেই হবে।
শিউলী ফিরে তাকায় শ্যামার দিকে। বলল, তুই বড় হয়েছিস। তোর বাবার প্রতি আমার অবহেলার কারণটা তোকে না বললে যে সারাজিবন আমি তোর কাছে অপরাধী হয়ে থাকবো।
– হ্যাঁ মা, বলো।
শিউলী বলতে শুরু করে।
-আমি যখন কলেজে পড়ি তখন আমার ক্লাসেরই একটি ছেলেকে ভালবেসেছিলাম। এমন ভালবাসা যে একজন আরেকজনকে একদিন না দেখেই থাকতে পারতাম না। আমাদের লেখাপড়া শেষ হলো। তারপর বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হলো তার পরিবারের কাছে। তার বাবা ছিল ঢাকার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। গুলশানে রাজ প্রাসাদের মতো নিজের বাড়ি ছিল তাদের। আর আমি তোর বড় মামার বাসায় থেকে লেখাপড়া করতাম। তোর মামা ছিলেন একটি কোম্পানির দাঁড়োয়ান। তারা খোঁজ নিয়ে যখন জানতে পারলো তখন তার বাবা-মা আমাকে বিয়ে করাতে রাজি হলোনা। ছেলেটি আমাকে কোন কিছু না বলেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। আর খুঁজে পেলাম না তাকে। কিন্তু তাকে আমি কতটা যে ভালবাসতাম তোকে বোঝাতে পারবনা। সেই থেকে সব ছেলেদের প্রতি আমার বিশ্বাস হারিয়ে গেল। তাই তোকে কোন ছেলের সঙ্গে মিশতে দেখলে আমার ভয় হয়। যদি তোর জীবনেও এমন কোন ঘটনা ঘটে।
কথাগুলো এক নাগারে বলতে বলতে শিউলীর দু‘চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। মায়ের চোখের পানি দেখে শ্যামাও আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলো না। দু’হাতে চোখের পানি মোছে মাকে বলল, সত্যিই তোমার জীবনটা অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। গল্পের শেষটুকুতো তুমি জানো না মা। শিউলী অবাক হয়। জিজ্ঞেস করলো, তার মানে?
– হ্যাঁ মা। তারপর সেই ছেলেটি বাবা-মায়ের অবাঁধ্য হয়ে তোমাকে বিয়ে করলো না। কিন্তু তোমার প্রতি যেন তার ভালবাসা নষ্ট না হয় সেজন্য অন্য কাউকে বিয়ে না করে বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেল আমেরিকায়। এই নিয়ে সে তিনবার দেশে এসেছে। দেশে এসে তোমার অনেক খোঁজ করেছে। যে ক’দিন দেশে থেকেছে প্রতিদিন রমনা পার্কের যেখানে তোমরা গল্প করতে সে জায়গাটিতে বসে থাকতো। তোমার কথা ভাবতো। সেই স্মৃতিগুলো তার চোখের সামনে ভেসে ওঠতো। এতেই সে সুখ পেতো। কারণ, তার মনের মধ্যে তুমি সেই আগের মতোই আছো। সেখানে আর অন্য কাউকে স্থান দেয়নি।
শিউলী শোনে আর অবাক হয়। শিউলী যেন ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরে গেল। তারপর অস্থির হয়ে বলল, তুই কি করে জানলি। বল, আমাকে। তুই কার কাছে শোনেছিস এসব কথা। আমাকে বল শ্যামা, আমাকে বল।
শ্যামা বলল, পার্কে পরিচয় হওয়া সেই লোকটির কাছে। তার বলা গল্পের সঙ্গে তোমার গল্প হুবহু মিলে গেছে।
কথাটা বলে শ্যামা দৌড়ে তার রুমে প্রবেশ করে। ব্যাগ থেকে একটি ছবি বের করে আবার আসে মায়ের কাছে। বলল, এই দেখো মা সেই লোকটির ছবি।
শিউলী ছবিটি হাতে নিয়ে দৃষ্টি আর ফেরাতে পারে না ছবিটির উপর থেকে। মুখভর্তি কাঁচাপাকা দাঁড়ি। কিন্তু চিনতে কোন অসুবিধা হয়নি। চোখ দু’টি সেই আগের মতোই আছে। যে চোখের দিকে তাকিয়ে শিউলী তার গভিড়ে হারিয়ে যেত। যে চোখের দিকে তাকিয়ে মনের ভাষা পড়ে ফেলতে পারতো শিউলী। মনের অজান্তেই যেন চোখের পানিতে ছবিটি ভিজে যাচ্ছিল। শিউলী তাকায় শ্যামার দিকে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, এই লোকটির কাছে আমাকে নিয়ে যাবি শ্যামা।
শ্যামা বলল, তা বোঁধহয় আর সম্ভব নয়। এতক্ষণে তার বিমান হয়তবা আকাশে উড়াল দিয়েছে। তিনি আজ চলে যাচ্ছেন। আর কখনো দেশে আসবেন না বলে আমাকে জানিয়ে গেছেন। আচ্ছা মা তুমি কি এখনো লোকটিকে ভালবাস?
শিউলী হু হু করে কাঁদতে থাকে। চোখের জলে তার বুক ভেসে যাচ্ছে। ছবিটিকে গভিড় ভালবাসায় বুকের সঙ্গে চেপে ধরে রেখেছে। বলল, তাকে এখনো কী যে ভালবাসি আমি কি করে বোঝাব।
শিউলী কেবল কাঁদতেই থাকে।

                                                                                                                                                                    

গল্প 02

দ্বিতীয়বার নির্বাচনে দাঁড়ানোর আগে জর্জ ডাব্লিউ বুশ টেক্সাসের কোন এক জায়গা থেকে গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন । রাস্তার পাশে ছিল শুয়োরের একটা খামার । আর গাড়ির ড্রাইভারও ছিল বেপরোয়া। হঠাৎ খামার থেকে একটা শুয়োর ছুটে এসে গাড়ির সামনে পড়লো । গাড়ির আঘাতে শুয়োরটা পিষ্ট হল ।

বুশ এটা দেখে ড্রাইভার কে অনেক বকাঝকা করলেন। তারপর শান্ত হয়ে বললেন , যাও , খামারের মালিকের কাছে যেয়ে মাফ চেয়ে আসো।
ড্রাইভার গেলো , ফিরল অনেকক্ষণ পর । হাতে অনেক খাবার এবং গিফটের প্যাকেট নিয়ে।
বুশ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো – এগুলো কি ?
আজ্ঞে , খামারের মালিকরা খুশি হয়ে আমাকে এগুলো দিল।
তুমি তাদের শুয়োর মারলে , আর তারা তোমাকে উপহার দিল ?সত্যি করে বল তো , তুমি তাদের কি বলেছ ?
আমি বলেছি- আমি বুশের গাড়ির ব্যক্তিগত ড্রাইভার । শুয়োরটা মরেছে। আমি নিজ হাতে গাড়ি চাপা দিয়ে শুয়োরটাকে মেরেছি ।

                                                                                                                                                              

গল্প 01

।। ও বন্ধু তোকে মিস করছি ভীষণ ।।

-: চুপ কর ।আর একটাও
কথা বলবিনা ।

-: আমি কথা না বললে সত্যিই
কি খুসী হবি ?

-: হ্যাঁ ।অনেক অনেক ।

-: আচ্ছা যা ।আমি আর তোর
সাথে কথা বলবো না ।যতক্ষণ তুই আগে না বলিস ।

-: ওকে থ্যাংকস ।

কথাটি শোনার পরই নীল লগ আউট করে বের হয়ে ঘুমুতে গেলো ।নীল ও মিম খুব ভালো বন্ধু ।
ওরা একে ওপরকে অনেক ছোট থেকেই চেনে ।পরষ্পরের সাথে ওদের ঝগড়া না করলে পেটের ভাত ওদের হজম হয় না ।আজকের মত এমন ঝগড়া ওদের প্রায়ই হয় ।তবে আজ ওরা একটু বেশীই সিরিয়াস ।
নীল এবার এইচ এস সি দিবে ।মিম ও ।ওরা অনেক অনেক ভালো বন্ধু । এতটাই ভালো যে পরষ্পর পরষ্পর ছেড়ে থাকতে পারে না ।প্রতিদিন তারা দিনে ফোনে কথা বলতো আর রাতেফেসবুকের সুবাদে চ্যাট করতো ।
ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে নীল তার ফোন চেক করলো ।না কোন ম্যাসেজই নেই ।মিমের কি আমার
কথা মনে পড়ছেনা ?ভাবে নীল । ওদিকে মিমেরও একই অবস্তা ।সেও মনে মনে ভাবছে যে একটু মনে হয় সে বেশীই বলেছে ।মিম ঠিক করে যে নীলতাকে কোন ম্যাসেজ করলে সে সরি বলবে ।
নীল সকালে ঘুম
থেকে উঠে নাস্তা করে বেরিয়ে পড়লোফ্রেন্ডদের সাথে আড্ডা দিতে ।
সামনে পরীক্ষা কিন্তু নীল গেলো আড্ডা দিতে ।এর একমাত্র কারণ হলোমিমকেভুলে থাকা ।কিন্তু সে তা পারছে না । তার আজ আড্ডা জমছে না ।সে একটু পর পরই ফেসবুকে লগ ইন
করে ইনবস্ক্য চেক করছে ।কিন্তু না কোনই রেসপন্স সে পাচ্ছেনা মিমের কাছে থেকে ।
মিম ও তার পিসির
সামনে বসে আছে ।কেবল একটি মাত্রইচাওয়া তার ।সে মনে করছে নীল কে ম্যাসেজ করতে ।কিন্তু এই বিষয়ে সে সামনে একধাপ
আগালে পেছনে যাচ্ছে তিন ধাপ ।
দুপুর আড়াইটা ।এসময় মিম নীলকে ফোন দিত ।তার খোঁজ খবর করতো ।কিন্তু আজ আর নীল কোন ফোন কলই পাচ্ছেনা ।
সে মাঝে মাঝে তার ফোন চেক করে দেখছে যে ফোনের নেটওয়ার্ক আছে কিনা ।না ,সবই ঠিক ।মিমই ওকে ফোন দিচ্ছেনা ।নীল এসময় কখনোই শুয়ে থাকত না ।আজ
সে শুয়ে আছে আর ভাবছে মিমের কথা ।
আজ কি মিম চ্যাটে আসবে ?
কথা বলবে আমার সাথে ?এমন কিছু প্রশ্ন নীল তার মনকে ছুড়ে দিল । কিন্তু উত্তর পেলো না ।
আর কয়েক ঘন্টা পড়ই তাদের কথা না বলার এক দিন পূর্ণ হবে । ভাবে মিম ।প্রতিদিন মিম সাড়ে দশটার দিকে নীলকে মিস কল দিয়ে অন লাইন হতো ।আর তখনই নীল চলে আসতো । তবে আজ আর সে মিস কল দিলো না । সে সরাসরিই অন লাইন করল ।প্রথমেই সেনীল কে খুঁজলো ।কিন্তু নীল বাদে সবাই ই উপস্থিত ছিল । ছেলেটা এমনকেন ?একটু
আগে কথা বললে কি ক্ষতি হয় ওর ? মনে মনে বলে মিম।
প্রায় এক ঘন্টা পর নীল আসে অন লাইনে ।কিন্তু মিমকে নক করে না ।তারা দুজনই বসে আছে একটি মাত্র নকের আসায় ।প্রায় ২

ঘন্টা কেঁটে গেলো কিন্তু এখনও তারা কেউই কথা বলেনি ।মিম এবার আর থাকতে পারলো না ।
সে নীলকে ফোন দিলো ।নীল ফোন আসারসাথে সাথে তা রিসিভ করে চুপ করে থাকল ।দুজনই নিরব ।কোন কথা নেই কারো মুখে ।একসময় নীল শুনতে পেলোমিমের কান্নার শব্দ । তারপর সেও কাঁদতে শুরু করে দিলো ।

*********************************************

%d bloggers like this: