একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনার রঙ


ফোকাস বাংলা ॥ ‘আবার ফুটেছে দেখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে কেমন নিবিড় হয়ে, কখনো মিছিল, কখনো বা একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়- ফুল নয় ওরা- শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর, একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনার রঙ। আগুনঝরা দ্রোহ আর বাঙালির জাগরণের অমর ভাষা আন্দোলনের মাস একুশে ফেব্রুয়ারি। রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মারক মহান শহীদ দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি। স্বজন হারানোর বেদনাদীর্ণ শোকের দিন। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার জন্য রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেওয়ার প্রথম নজির। কালক্রমে সেই শোকের দিন উত্তীর্ণ হয়েছে বাঙালির জাগরণের মহাশক্তির প্রতীক হিসেবে। মঙ্গলবার ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশে শহীদ দিবস নয়, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয় বিশ্বের ১৮৮টি দেশে। আজ থেকে ৬০ বছর আগে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। বরকত, রফিক, সালাম, জব্বারসহ নাম না জানা বেশ ক’জন শহীদের তাজা রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল; যার চূড়ান্ত রূপ হিসেবে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন তাই এদেশের রক্তঝরা প্রথম গণতান্ত্রিক আন্দোলন। ১৯৪৮ সালে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির মধ্য দিয়ে যে সংগ্রামের শুরু, বায়ান্নতে সেই আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি রক্তের আখরে। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তনে পাকিস্তানের তদানীন্তন গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দম্ভভরে উচ্চারণ করেন, ‘উর্দু, কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ এ ঘোষণায় সেখানে উপস্থিত ছাত্রদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ছাত্ররা প্রকাশ্যে জিন্নাহর এ ঘোষণার প্রতিবাদ জানান। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে বাংলার মানুষ। সে বছরই গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। শুরু হয় মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের জন্য বাঙালির প্রাণপণ সংগ্রাম। বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারির সেই সকালে বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থাপিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সভা থেকে ডাক আসা মাত্রই ১৪৪ ধারা ভাঙতে একের পর এক দশজনের মিছিল বের হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় গেট থেকে। সেদিন বিকেল সাড়ে তিনটায় অনুষ্ঠেয় প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে পরিষদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিয়ে ছাত্ররা সমবেত হয় মেডিকেল কলেজ হোস্টেল গেটের সামনেও। সকাল থেকে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার সঙ্গে রক্তাক্ত সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ হঠাৎ মেডিকেল হোস্টেল গেটের সামনে ও বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে জড়ো হওয়া ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমদ ও আবদুল জব্বার। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সফিউর রহমান, রিকশাচালক আবদুল আউয়াল, অহিউল্লাহসহ অসংখ্য অজ্ঞাত মানুষ। এ ছাড়া ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত আবদুস সালাম মারা যান ৭ এপ্রিল।
এদিকে ভাষার জন্য রাজপথের এ আত্মবলিদান গোটা দেশেই আন্দোলনকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেয়। ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি গোটা প্রদেশে হরতাল পালিত হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হলেও আন্দোলন অব্যাহত থাকে। গণআন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা নতিস্বীকারে বাধ্য হলে বাঙালির আন্দোলনের বিজয় অর্জিত হয়। পাকিস্তান গণপরিষদ ওই বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি গৃহীত সংবিধানের মাধ্যমে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাদের ৩০তম সম্মেলনে ২৮টি দেশের সমর্থনে দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৮৮টি দেশে একযোগে পালিত হচ্ছে। বাঙালির সুমহান আত্মত্যাগের এ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাই বাঙালি জাতির জন্য এক অনন্যসাধারণ অর্জন। এ গৌরব কেবল বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশেরই নয়, বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও। বায়ান্নর একুশের রক্তঝরা ঘটনার এক দিন পরই মহান শহীদদের স্মরণে গড়ে উঠেছিল শহীদ মিনার। একুশের সব স্মৃতি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার লক্ষ্যে নির্মাণের পর দিনই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তা। কবিতার পক্তিমালায় তখন উচ্চারিত হয়েছিল কোটি মানুষের দৃপ্ত শপথ ‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার ভয় কি বন্ধু/… ইটের মিনার/ভেঙেছে ভাঙুক। ভয় কি বন্ধু,/দেখো একবার আমরা জাগরী চার কোটি পরিবার…।’

Advertisements

About মোঃ আবুল বাশার

আমি একজন ছাত্র,আমি লেখাপড়ার মাঝে মাঝে একটা ছোট্ট প্রত্রিকা অফিসে কম্পিউটার অপরেটর হিসাবে কাজ করে,নিজের হাত খরচ চালানোর চেষ্টা করি, আমি চাই ডিজিটাল বাংলাদেশ হলে এবং তাতে সেই সময়ের সাথে যেন আমিও কিছু শিখতে পারি। আপনারা সকলে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পরার চেষ্টা করি এবং অন্যকেও ৫ওয়াক্ত নামাজ পরার পরামর্শ দিন। আমার পোষ্ট গুলো গুরে দেখার জন্য ধন্যবাদ, ভাল লাগেলে কমেন্ট করুন। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে,ভুল ত্রুটি,হাসি,কান্না,দু:খ,সুখ,এসব নিয়েই মানুষের জীবন। ভুলে ভড়া জীবনে ভুল হওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়,ভুল ত্রুটি ক্ষামার দৃর্ষ্টিতে দেখবেন। আবার আসবেন।

Posted on 21/02/2012, in News and tagged . Bookmark the permalink. এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান.

পোষ্টটি আপনার কেমন লেগেছে? মন্তব্য করে জানান।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: