গল্প কী যে ভালবাসি!


পূর্ব প্রকাশের পর…..

এফএনএস ॥ শ্যামার বাসায় ফিরতে আজ দেরী হচ্ছে। কলেজ ছুটি হওয়ার কথা সেই তিনটায়। অথচ সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। শ্যামা ফিরছেনা। মা শিউলী বেশ উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে। ভুলে আজ মোবাইলটাও নেয়নি শ্যামা। তাতে কি, অন্যকারো মোবাইল থেকেওতো দেরী হওয়ার কারণটা জানাতে পারতো মাকে। বান্ধবীদের কারো মোবাইল নাম্বারও নেই মায়ের কাছে। শ্যামা সাধারণত: এতটা দেরী করে না। তাছাড়া বান্ধবীদের বাসা বা অন্য কোথাও গেলে মাকে অবশ্যই জানিয়ে যায়। তাছাড়া কলেজের বাইরে কোথাও যাওয়াটা মা একদম পছন্দ করেন না শ্যামাও তা জানে। মা একবার বাইরে যাচ্ছেন আবার ভেতরে প্রবেশ করছেন। অস্থির হয়ে পায়চারী করছেন সেই কখন থেকে। এমন সময় কলিং বেল বেজে ওঠে। মা দ্রুত গিয়ে দরজা খোলে। শ্যামাকে দেখামাত্র দেরী হওয়ার কারণটা জানার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে শিউলী। শ্যামা তাতে বিরক্ত প্রকাশ করে। মাকে বলে, মা তেমন কিছুই হয়নি। আমাকে একটু ফ্রেস হতে দাও। তারপর বলছি।
শ্যামা কলেজ ড্রেস ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়। গিয়ে বারান্দায় বসে। শিউলীর যেন তর সইছে না। শিউলী বলল, এবার বল মা কোথায় গিয়েছিলি? কেন দেরী হয়েছে। – সত্যি সত্যি বলবো মা। – হ্যাঁ, সত্যি করে বল। – তুমি আবার রাগ করবেনাতো? – আহ, আগে বলতো দেখি। শিউলী মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। তারপর বলল, আজ আমাদের শেষের দু’টি ক্লাস হয়নি মা। তাই আমরা দুই বান্ধবী মিলে রমনা পার্কে বেড়াতে গিয়েছিলাম। কয়েকদিন আগে পার্কে একটি লোক আমাদের ফলো করেছিল। আমরা যেদিকে যাই সেদিকেই যাচ্ছিল। শিউলী চমকে ওঠে। – বলিস কি? কোন সমস্যা করেনিতো? – আহ, তুমি আগে ঘটনাটা শোনে নাও। তারপর লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি আমাদের ফলো করছেন কেন? শিউলী আবারো চমকে ওঠে। বলল, বলিস কি তুই লোকটার সাথে কথা বলেছিস? – বলবনা। লোকটা আমাদের কেন ফলো করছে তা জানতে হবে না? – তারপর? – তারপর লোকটি বললো আমাকে নাকি তার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। আমাকে নাকি তার খুব কাছের কোন একজন বলে মনে হচ্ছিল। সেই লোকটির সঙ্গে আজ আবার ঠিক একই জায়গায় আমাদের দেখা হয়েছে। লোকটি তার জীবনের অনেক কথা আমাদের বলেছে। আমাদের আজ চাইনিজও খাইয়েছে। কাল আবার দেখা করতে বলেছে। শিউলী এবার অনেকটা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। বলল, ভ-। মস্ত বড় ভ-। এসব করে তোর সাথে ভাব জমাতে চাচ্ছে। তোকে না বলেছি কোনদিন কোন পুরুষ মানুষের সঙ্গে মিশবিনা।
– লোকটি আমার বাবার বয়সী মা। – পুরুষ মানুষের বয়স বলে কিছু নেই। এই বয়সের পুরুষগুলো আরো বেশি খারাপ হয়। শ্যামা আর কিছুই বলে না। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে। শ্যামা যখন একটু একটু বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই মায়ের পুরুষ বিদ্বেষী এই মনোভাবটা দেখে আসছে। শ্যামাকেও কোন ছেলের সঙ্গে কথা বলতে দেখলে যেন মায়ের মাথা খারাপ হয়ে যায়। এমনকি তার বাবাকেও সহ্য করতে পারেনি মা। যে কারণে বাবার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। শ্যামার তখন সাত বছর। বাবা তার মাকে বলেছিল, তোমার আমার সম্পর্কটা অনেকটা যন্ত্রের মতো। এভাবে জীবনটাকে আর কতটা টেনে নিয়ে যবো। উত্তরে মা বলেছিল, আমার কিছুই করার নেই। মৃত্যুপথযাত্রী বাবার ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে তোমাকে বিয়ে করেছি। তোমার কাছে আমি একটা যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নই। কারণ, আমার মনটা অন্য একজনকে দিয়ে দিয়েছি। মনতো একজনকেই দেয়া যায়। তারপর মা তার বাবাকে ডিভোর্স দিয়ে শ্যামাকে নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। মা আর তার বাবার বাড়িতেও ফিরে যায়নি। একটি স্কুলে শিক্ষকতা করে শ্যামাকে নিয়েই এতটা বছর কাটিয়ে দিয়েছে। শ্যামা পরে জানতে পেরেছে মায়ের সঙ্গে আলাদা হওয়ার কিছুদিন পরেই তার বাবাও মারা যান। অথচ বাবার কোন দোষ ছিল না। বাবা অস্বাভাবিক ভালবাসতো মাকে। মা কেবল অবহেলাই করেছেন বাবাকে। কিন্তু কেন? কেন বাবার প্রতি এতটা অবহেলা ছিল মায়ের? কেন পৃথিবীর সব পুরুষের প্রতি এতটা বিদ্বেষ, এতটা অবহেলা? শ্যামা এই প্রশ্নের উত্তর অনেকবার জানতে চেয়েছে মায়ের কাছে। কিন্তু মা কখনো এই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। বরং বিভিন্নভাবে এড়িয়ে গেছেন। মাকে সেই একই প্রশ্ন বার বার করতে তার ইচ্ছে হচ্ছিল না। শিউলী শ্যামাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুই আমাকে একটা কথা দে মা। তুই কখনো আর পার্কে যাবি না। ঐ লোকটার সাথে আর দেখা করবিনা। শ্যামা তাকায় মায়ের দিকে। শিউলীর দু‘চোখে তখন পানি জমে ওঠেছে। মাকে দেখে শ্যামার বেশ মায়া হলো। বলল, ঠিক আছে মা। তোমার কথার অবাঁধ্য হবো না। শিউলী শ্যামাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে। শ্যামাও ছোট্ট শিশুর মতো মায়ের বুকের সঙ্গে মিশে থাকে। শ্যামা মায়ের বুকের ভেতর এক ধরনের উত্তাপ অনুভব করে। শ্যামার ধারণা এই উত্তাপই যেন পুরুষের প্রতি মায়ের এত ঘৃণার কারণ। বুক থেকে মাথা তুলে মায়ের চোখের দিকে তাকায় শ্যামা। বলল, তোমার কাছে সেই কথাটি আবারো জানতে ইচ্ছে করছে মা।
– কোন কথাটি? মা প্রশ্ন করেন।
– ছেলেদের প্রতি তোমার এত অবিশ্বাস আর ঘৃণা কেন? যে কারণে বাবাকেও সহ্য করতে পারোনি?
শিউলী চুপ করে থাকে। শ্যামাকে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ায়। বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরে তাকায়। শ্যামাও মায়ের পেছনে দাঁড়ায়। হাত রাখে মায়ের কাঁধে। তারপর আবার প্রশ্ন করে, মা আজ আর চুপ করে থেকোনা। আমাকে আজ বলতেই হবে। শিউলী ফিরে তাকায় শ্যামার দিকে। বলল, তুই বড় হয়েছিস। তোর বাবার প্রতি আমার অবহেলার কারণটা তোকে না বললে যে সারাজিবন আমি তোর কাছে অপরাধী হয়ে থাকবো।
– হ্যাঁ মা, বলো। শিউলী বলতে শুরু করে।
-আমি যখন কলেজে পড়ি তখন আমার ক্লাসেরই একটি ছেলেকে ভালবেসেছিলাম। এমন ভালবাসা যে একজন আরেকজনকে একদিন না দেখেই থাকতে পারতাম না। আমাদের লেখাপড়া শেষ হলো। তারপর বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হলো তার পরিবারের কাছে। তার বাবা ছিল ঢাকার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। গুলশানে রাজ প্রাসাদের মতো নিজের বাড়ি ছিল তাদের। আর আমি তোর বড় মামার বাসায় থেকে লেখাপড়া করতাম। তোর মামা ছিলেন একটি কোম্পানির দাঁড়োয়ান। তারা খোঁজ নিয়ে যখন জানতে পারলো তখন তার বাবা-মা আমাকে বিয়ে করাতে রাজি হলোনা। ছেলেটি আমাকে কোন কিছু না বলেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। আর খুঁজে পেলাম না তাকে। কিন্তু তাকে আমি কতটা যে ভালবাসতাম তোকে বোঝাতে পারবনা। সেই থেকে সব ছেলেদের প্রতি আমার বিশ্বাস হারিয়ে গেল। তাই তোকে কোন ছেলের সঙ্গে মিশতে দেখলে আমার ভয় হয়। যদি তোর জীবনেও এমন কোন ঘটনা ঘটে। কথাগুলো এক নাগারে বলতে বলতে শিউলীর দু‘চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। মায়ের চোখের পানি দেখে শ্যামাও আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলো না। দু’হাতে চোখের পানি মোছে মাকে বলল, সত্যিই তোমার জীবনটা অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। গল্পের শেষটুকুতো তুমি জানো না মা। শিউলী অবাক হয়। জিজ্ঞেস করলো, তার মানে?
– হ্যাঁ মা। তারপর সেই ছেলেটি বাবা-মায়ের অবাঁধ্য হয়ে তোমাকে বিয়ে করলো না। কিন্তু তোমার প্রতি যেন তার ভালবাসা নষ্ট না হয় সেজন্য অন্য কাউকে বিয়ে না করে বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গেল আমেরিকায়। এই নিয়ে সে তিনবার দেশে এসেছে। দেশে এসে তোমার অনেক খোঁজ করেছে। যে ক’দিন দেশে থেকেছে প্রতিদিন রমনা পার্কের যেখানে তোমরা গল্প করতে সে জায়গাটিতে বসে থাকতো। তোমার কথা ভাবতো। সেই স্মৃতিগুলো তার চোখের সামনে ভেসে ওঠতো। এতেই সে সুখ পেতো। কারণ, তার মনের মধ্যে তুমি সেই আগের মতোই আছো। সেখানে আর অন্য কাউকে স্থান দেয়নি। শিউলী শোনে আর অবাক হয়। শিউলী যেন ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরে গেল। তারপর অস্থির হয়ে বলল, তুই কি করে জানলি। বল, আমাকে। তুই কার কাছে শোনেছিস এসব কথা। আমাকে বল শ্যামা, আমাকে বল। শ্যামা বলল, পার্কে পরিচয় হওয়া সেই লোকটির কাছে। তার বলা গল্পের সঙ্গে তোমার গল্প হুবহু মিলে গেছে। কথাটা বলে শ্যামা দৌড়ে তার রুমে প্রবেশ করে। ব্যাগ থেকে একটি ছবি বের করে আবার আসে মায়ের কাছে। বলল, এই দেখো মা সেই লোকটির ছবি। শিউলী ছবিটি হাতে নিয়ে দৃষ্টি আর ফেরাতে পারে না ছবিটির উপর থেকে। মুখভর্তি কাঁচাপাকা দাঁড়ি। কিন্তু চিনতে কোন অসুবিধা হয়নি। চোখ দু’টি সেই আগের মতোই আছে। যে চোখের দিকে তাকিয়ে শিউলী তার গভিড়ে হারিয়ে যেত। যে চোখের দিকে তাকিয়ে মনের ভাষা পড়ে ফেলতে পারতো শিউলী। মনের অজান্তেই যেন চোখের পানিতে ছবিটি ভিজে যাচ্ছিল। শিউলী তাকায় শ্যামার দিকে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, এই লোকটির কাছে আমাকে নিয়ে যাবি শ্যামা।
শ্যামা বলল, তা বোঁধহয় আর সম্ভব নয়। এতক্ষণে তার বিমান হয়তবা আকাশে উড়াল দিয়েছে। তিনি আজ চলে যাচ্ছেন। আর কখনো দেশে আসবেন না বলে আমাকে জানিয়ে গেছেন। আচ্ছা মা তুমি কি এখনো লোকটিকে ভালবাস? শিউলী হু হু করে কাঁদতে থাকে। চোখের জলে তার বুক ভেসে যাচ্ছে। ছবিটিকে গভিড় ভালবাসায় বুকের সঙ্গে চেপে ধরে রেখেছে। বলল, তাকে এখনো কী যে ভালবাসি আমি কি করে বোঝাব। শিউলী কেবল কাঁদতেই থাকে।

Advertisements

About মোঃ আবুল বাশার

আমি একজন ছাত্র,আমি লেখাপড়ার মাঝে মাঝে একটা ছোট্ট প্রত্রিকা অফিসে কম্পিউটার অপরেটর হিসাবে কাজ করে,নিজের হাত খরচ চালানোর চেষ্টা করি, আমি চাই ডিজিটাল বাংলাদেশ হলে এবং তাতে সেই সময়ের সাথে যেন আমিও কিছু শিখতে পারি। আপনারা সকলে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পরার চেষ্টা করি এবং অন্যকেও ৫ওয়াক্ত নামাজ পরার পরামর্শ দিন। আমার পোষ্ট গুলো গুরে দেখার জন্য ধন্যবাদ, ভাল লাগেলে কমেন্ট করুন। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে,ভুল ত্রুটি,হাসি,কান্না,দু:খ,সুখ,এসব নিয়েই মানুষের জীবন। ভুলে ভড়া জীবনে ভুল হওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়,ভুল ত্রুটি ক্ষামার দৃর্ষ্টিতে দেখবেন। আবার আসবেন।

Posted on 03/03/2012, in গল্প and tagged . Bookmark the permalink. এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান.

পোষ্টটি আপনার কেমন লেগেছে? মন্তব্য করে জানান।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: