মরিচিকা নয়,স্বচ্ছতার আলো জ্বলে উঠুক (শিখা ব্যানার্জী)


আমি ঢাকার মেয়ে, সেই জন্মকাল থেকে টানা ২৬টি বছর আমি ঢাকায় কাটিয়েছি। সাঁতার শিখেছি লেকসার্কাস কলাবাগানে থাকাকালীন বিশাল বড় পুকুরে।কলাবাগান আর শুক্রাবাদের মাঝে বিশাল ধানের ক্ষেত, আর তার পাশে দীর্ঘ লেক গিয়ে মিশেছে ধানমন্ডি লেকের সাথে।মাঝে মাঝেই শকুনের ঝাঁক দেখতে পেতাম বিস্তৃত জমিতে পড়ে থাকা মৃত গরু বা অন্য কোন জীব-জন্তুর উপর।রাস্তা-ঘাট ছিল ছিমছাম, দালান-কোঠার এত জঞ্জাল তখন ঢাকায় ছিলনা। গ্রাম্যরা গ্রামেই সুন্দর ভাবে বাঁচত,বানের জলে খড়-কুটোর মতভেসে আসতোনা ঢাকার বুকে। তাই এখনকার মত এত নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন ছিলনা তখন রাজধানী ঢাকা।আমরা খুব সকালে হেঁটে হেঁটেই ধানমন্ডির ছায়া-সুনিবিড় রাস্তা ধরে অনেক দূর চলে যেতাম।ধানমন্ডির একতলা/দোতলা আবাসিক ভবন গুলো দেখলে চোখ জুড়াতো।জনসংখ্যা কার্যক্রমও তখন বেশ সক্রিয় ছিল, ফলে এখনকার মত জনবিস্ফোরন ঘটতে পারেনি।
কিন্তু আমরা আমাদের ভাল কোন কিছুই আজ আর ধরে রাখতে পারিনি। যেমন পারিনি ধরে রাখতে স্বাধীনতার মহোত্তম অর্জনকে। তাই আজ স্বাধীন দেশে ভায়ে ভায়ে তীব্র সহিংসতা দানা বেঁধে উঠেছে ।পারিনি তরুন প্রজন্মকে আলোর দিশারী করতে, তাই আজ তারা সন্ত্রাসী বলে চি‎িহ্ণতহচ্ছে, মাদকাসক্ত হয়ে তলিয়ে যাচ্ছে অবক্ষয়ের অতল অন্ধকারে।আমরা আমাদের সীমাহীন লোভের মুখে লাগাম টেনে ধরতে পারিনি,তাই প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে চলছে মুনাফা লোটার তীব্র প্রতিযোগিতা, কে কত বেশি খেতে পারে, তারই মাতম চলছে দেশ জুড়ে।আমরা আইনের শাসনকে দুর্বল করে রেখেছি নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য। তাই দুর্বৃত্তেরা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়েই চলেছে।আমরা গ্রামকে উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারিনি, পারিনি খেটে খাওয়া মানুষ গুলোকে তাদের ন্যায্য পাওনা টুকু দিতে। ফলে হতাশার দাবানল জ্বলে উঠছে চারদিকে, ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে সেই মানুষ গুলি দিশেহারা হয়ে পড়ছে,বাঁচার তাগিদে শহর মুখী হচ্ছে,আর নানা ভাবে বিপদগ্রস্ত হচ্ছে, না পারছে রোজগারের কোন নিশানা করতে, মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে খোলা আকাশের নিচে,নয়তো স্টেশন চত্বরে। শেষমেশ কেউ কেউ হয়তো বা ভাড়ায় রিকশা টানছে, কেউ ফেরি করছে,কেউবা অনন্যোপায় হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে অসৎ পথে অর্থ উপার্জন করে একশ্রেণীর লোক রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাচ্ছে, ভোজবাজীর মত আলিশান বাড়ি বানিয়ে ফেলছে ২/৩টা, দামী দামী গাড়িও কিনছে জনপ্রতি ৩/৪টা। ফলে রাজধানী জনচাপ,বাড়িচাপ আর গাড়িচাপে হাঁসফাস করে মরছে।খেলার মাঠগুলোও দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে ইট-বালু-সিমেন্টের আস্তরনে। ফলে ব্যহত হচ্ছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। ব্যবসাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠছে বলতে গেলে প্রতি মহল্লায়। কত বাহারি নামের কিন্ডার গার্ডেন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্য্লায় গুলো পর্যন্ত চমক ছড়াচ্ছে ঢাকার বুকে।ফলে কোথাও একটু মুক্ত বাতাস নেবার জো নেই একদা তিলোত্তমা নামধারী ঢাকায় এখন।এমনই দুর্বিষহ অবস্থা হয়েছে তার,যেদিকেই তাকানো যায়,সেদিকেই শুধু সুউচ্চ অট্টালিকা যেন আকাশ ফুড়ে উঠে গেছে।রাস্তার দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যায়, প্রশস্ত রাস্তার কোথাও তিল ধারনের ঠাঁই নেই, ছিন্নমূলদের অগতির গতি হল রিকশা,হাজার হাজার রিকশা চলছে তো চলছেই, আর বিত্তবানদের ব্যক্তিগত গাড়িও চোখে পড়ার মত।এত অর্থ তারা পায় কোথ্থেকে?যে দেশ দাতা গোষ্ঠীদের ঋণের ভারে জর্জরিত, ভিক্ষাও চাইতে হয় যে দেশকে,সেদেশের এই হটাৎ বড়লোকদের আয়ের উৎস সম্বন্ধে জনমনে প্রশ্ন জাগে বৈকি!আর এসব প্রশ্নের সঠিক জবাব খুঁজে বের করতে পারে একমাত্র আইনের সুশাসন। যে কাজটা আজপর্যন্ত এদেশে কার্যকর হতে পারেনি। তাই আবারও প্রশ্ন জাগে তাহলে কি লাভ হল দেশ স্বাধীন করে? রাজধানী হল যে কোন দেশের প্রাণকেন্দ্র, আর তাকেই যদি দমবন্ধ করে মেরে ফেলার কার্যক্রম চলতে , থাকে তাহলে সমগ্র দেশটা বাঁচবে কি করে?তাই দেশকে বাঁচাতে হলে, সুখী ও সমৃদ্ধশালী করতে হলে রাজধানীকৈ করে তুলতে হবে আদর্শের পীঠস্থান, তাকে হতে হবে সঠিক দিক-নির্দেশনার কেন্দ্রবিন্দু।যে কেন্দ্র সততা আর নিষ্ঠারই পরিচর্যা করবে, আর কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করবে সমস্ত অপকর্ম।তবেই না দেশটা সার্বিক অর্থে সাফল্যমন্ডিত হয়ে উঠবে। রাজধানী তো মরিচীকা হতে পারেনা যে শুধু আকর্ষন করে শূন্যে মিলিয়ে যাবে। হতে পারেনা এমন আলো যে আলোয় আকৃষ্ট হয়ে পতঙ্গ আত্মাহুতি দেয়। দেশের জন্য, দশের জন্য ক্ষতিকর এমন যে কোন কার্যকলাপই কঠোর হাতে দমন করার ক্ষমতা থাকতে হবে রাজধানীর। তার আলোর গতি এতটাই তীক্ষè হতে হবে যেন অন্ধকার জগতের কোন অস্তিত্বই আর না দেখা যায়। উন্নত দেশে এভাবেই অত্যন্ত কঠোরতার সাথে, অত্যন্ত সততার সাথে, অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে দেশের স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট হয় তারা,তাই সেসব দেশে অনুমোদন ছাড়া কোন দালান-কোঠা উঠতে পারেনা, ভুঁয়া লাইসেন্সধারী কোন ড্রাইভার রাস্তায় গাড়ি নিয়ে নামতে পারেনা, গ্রামথেকে অনিশ্চিত জীবনের জন্য শহরে পাড়ি জমায় না সে দেশের মানুষ। তারা যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে জানে,তারা সৃষ্টিশীলতার মর্যাদাদিতে জানে। তাই সেসব দেশেকোন উৎপাদিত পণ্য পচে গলে নষ্ট হয়না। কারন তারা তড়িৎ গতিতে পণ্য সরবরাহের সুবন্দোবস্ত করে। পণ্যের বহুমুখী ব্যবহারও নিশ্চিত করতে জানে তারা। ফলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। এসবই সম্ভব হয় শুধু আইনের শাসন আছে বলে।জবাবদিহিতার বাধ্যবাধকতা আছে বলে। আর আমাদের দেশে ঠিক উল্টোটাই চলছে। এখানে ব্যবসায়িরা জেনেশুনে প্রায় ৯০% খাবারে বিষ ভেজাল মিশিয়ে মানুষ মারার নির্মম খেলায় মেতে উঠেছে,জবাবদিহিতার বালাই থাকলে কি এসব জঘন্য কাজ তারা করতে পারতো? ঢাকা এখন দূষনের নগরী, যানজটের নগরীতে পরিনত হয়েছে।যতই দিন যাচ্ছে,ততই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে ঢাকাবাসীর হাঁটা-চলা,খাওয়া-পড়া সবকিছু। আর ওদিকে রাজনীতির পবিত্র অঙ্গনে ঢুকে পড়ে খল-রাজনীতিবিদেরা উন্নয়নের কফিনে অনবরত পেরেক ঠুকে যাচ্ছে।ভাবতে অবাক লাগে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদই ব্যবসার সাথে জড়িত!অর্থাৎ ব্যবসায়ি মহল থেকে তারা রাজনীতির অঙ্গনে জেঁকে বসেছে, কিন্তু কিছু গ্রহনও করেনি, কিছু বর্জনও করেনি। ফলে তাদের মধ্যে দেশের জন্য যে মমত্ববোধ, দেশের উন্নয়নে যে আত্মত্যাগের সংস্কৃতি থাকা আবশ্যক, তা আমরা দেখতে পাইনা।ব্যবসায়ি তারা,মুনাফার পিছনে ছুটবেই ,এ সংস্কৃতি তাদের রক্তে মিশে আছে, তাই দেশটাকে ভাঙিয়েই ব্যবসা করে খাচ্ছে। ফলে দেশে কাঙ্খিত উন্নয়ন হতে পারছেনা কোনক্ষেত্রেই। তদুপরি দেশটা যে এখনো টিকে আছে, তা ঐ অবহেলিত,নিষ্পেষিত জনগনের কর্মফলের আশীর্বাদে।আধপেটা,একপেটা খেয়ে ,ঋণে জর্জরিত হয়েও তারা তাদের সেরা শ্রমটাই দিয়ে যাচ্ছে, আর ক্ষমতা লিপ্সু লোভী মানুষগুলো সেই রক্তজল করা শ্রমের ফসলটুকু চেটেপুটে খেয়ে দিন দিন ফুলে-ফেঁপে উঠছে। কারন আজ পর্যন্ত এদেশের প্রশাসন ঐসব লোভাতুর পাপিষ্ঠদের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারেনি।ফলে অপকর্মেরই জয়-জয়কার আজ চতুর্দিকে। এ ভয়ানক অবস্থা থেকে মুক্ত হতে হলে কেন্দ্রকেঅবশ্যই ন্যায়-নীতির প্রশ্নে অটল থাকতে হবে, স্বজন-প্রীতির কোনস্থান সেখানে থাকতে পারবেনা।প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার স্বাক্ষর রাখতে হবে।
উন্নত বিশ্ব দ্রুত এগিয়ে চলেছে, নাগরিক জীবন,গ্রামীন জীবন তারা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তোলার নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।সম্প্রতি ইতালিতে যানজট এড়াতে তারা গাড়ির সংখ্যা কমাতে শুরু করেছে, পরিবেশবান্ধব সাইকেল চালানোকে উৎসাহিত করছে, এমনকি ছাত্র=ছাত্রীদের পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়ার নান্দনিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমাদেরও উচিৎ এসব দৃষ্টান্ত অনুসরন করা, কারন যানজটই ঢাকার প্রধান সমস্যা বলে প্রমানিত হয়েছে, এজন্য ঝরে যাচ্ছে অকালে কচি কচি তাজা প্রাণগুলো,নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার শ্রমঘন্টা। তাই এখনই এই ভয়াবহ জট নিরসনে উদ্যোগী হতে হবে এবং ঢাকাকে করে তুলতে হবে সর্বাঙ্গীন সুন্দর তিলোত্তমা রূপে। (লেখক ঃ প্রভাষক,প্রাণিবিদ্যা, বাউফল কলেজ, বাউফল,পটুয়াখালী)

Advertisements

About মোঃ আবুল বাশার

আমি একজন ছাত্র,আমি লেখাপড়ার মাঝে মাঝে একটা ছোট্ট প্রত্রিকা অফিসে কম্পিউটার অপরেটর হিসাবে কাজ করে,নিজের হাত খরচ চালানোর চেষ্টা করি, আমি চাই ডিজিটাল বাংলাদেশ হলে এবং তাতে সেই সময়ের সাথে যেন আমিও কিছু শিখতে পারি। আপনারা সকলে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পরার চেষ্টা করি এবং অন্যকেও ৫ওয়াক্ত নামাজ পরার পরামর্শ দিন। আমার পোষ্ট গুলো গুরে দেখার জন্য ধন্যবাদ, ভাল লাগেলে কমেন্ট করুন। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে,ভুল ত্রুটি,হাসি,কান্না,দু:খ,সুখ,এসব নিয়েই মানুষের জীবন। ভুলে ভড়া জীবনে ভুল হওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়,ভুল ত্রুটি ক্ষামার দৃর্ষ্টিতে দেখবেন। আবার আসবেন।

Posted on 21/03/2012, in অন্যান্য and tagged . Bookmark the permalink. এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান.

পোষ্টটি আপনার কেমন লেগেছে? মন্তব্য করে জানান।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: