একি করলেন আপুমণিরা! (শিখা ব্যানার্জী)


অবরোধবাসিনী বেগম রোকেয়া তিল তিল করে অনুভব করেছিলেন নারী হবার যন্ত্রনা। শুধুমাত্র মেয়ে হয়ে জন্মানোর অপরাধে সূর্যের আলো গায়ে লাগাতেও বারন ছিল তাদের সে যুগে। লেখাপড়া তোদূরের কথা। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার কার্যবিধি অপার রহস্যে ভরা। তাই বিদ্যাশিক্ষার কোন সুযোগ বা উপায় যাদের নেই, তাদের অন্তর জুড়েও তিনি প্রবল জ্ঞানস্পৃহা জাগিয়ে তুলবেন কেন? বেগম রোকেয়া সতৃষ্ণ নয়নে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতেন একই বাড়িতে ছেলে সদস্যরা বীরদর্পে স্কুলে যাচ্ছে, কলেজে যাচ্ছে, ঘুরছে ফিরছে, অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ভোগ করছে। তাঁর অন্তর জুড়ে প্রবল প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল, জানতে ইচ্ছে করেছিল কি আছে কালির আঁচড়ে ভরা ঐ পাতা গুলোতে? কেন তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে যুগ যুগ ধরে সে রস আস্বাদন থেকে? তাঁর বড় ভাই যখন পড়তে বসতেন, ছোট্ট রোকেয়া সতৃষ্ণ নয়নে তাকিয়ে থাকতেন সেদিক পানে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হল তাঁর , হতাশার কাল মেঘ যেন হঠাৎই দমকা হাওয়া লেগৈ দূরে সরে যেতে লাগল। ছোট্ট বোনটির প্রবল জ্ঞানস্পৃহা লক্ষ্য করেছিলেন বড় ভাই দীর্ঘদিন ধরে। সমবেদনায় ভরে উঠেছিল তাঁর বিশাল অন্তর। কিন্তু তাঁর মত করে বোনটিকে বিদ্যাশিক্ষার উজ্জ্বল আলোতে নিয়ে যেতে পারলেননা। তাই রাতের আঁধারে নিভৃত কক্ষে সকলের অগোচরে একটু একটু করে সুশিক্ষার আলোকে আলোকিত করতে লাগলেন পরম স্নেহের ছোট্ট বোনটিকে। জ্ঞানালোকে প্রবেশাধিকার পেয়ে বোনটিও যেমন আনান্দে আত্মহারা হয়েছিলেন,তেমনি অবরোধবাসিনী শত শত নারীদের বিদ্যাশিক্ষাহীন পরনির্ভরশীল জীবনের কথা চিন্তা করে অত্যন্ত বেদনাহত হয়েছিলেন। যতই তিনি সুশিক্ষার আলোকপ্রাপ্তা হতে লাগলেন, ততই তিনি নারী মুক্তির উপায় খুঁজতে লাগলেন। তবে সে কাজ ছিল বড়ই কঠিন, বড়ই বন্ধুর। কিন্তু তিনি দমে গেলেননা। এই মহীয়সী নারীর ভাগ্য ভাল যে জীবন সঙ্গী হিসেবে যাঁকে পেয়েছিলেন, তিনিও তাঁর শিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ফলে বেগম রোকেয়া বাস্তবিক অর্থেই সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর মহান ব্রত পালন শুরু হয় স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর। গুটিকয়েক ছাত্রী নিয়ে শুরু করেন তিনি পথ চলা , অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তিনি নারী জাতিকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে শিক্ষা ছাড়া কোন উন্নয়নই সম্ভব নয়। বুঝাতে পেরেছিলেন যে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে হবে, নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও সুশিক্ষিত হয়ে উঠবেনা। তারই পথ ধরে এগোতে এগোতে আজ নারী সমাজ এতদূর পৌঁছাতে পেরেছে, ঘরে-বাইরে সর্বত্রই রাখছে প্রতিভার স্বাক্ষর। সন্তানকে সুশিক্ষার আলোর নিশানা দেখাতে পারছে। আজ জগতের হেন কর্ম নেই যেখানে নারী সমাজ অবদান রাখতে পারছেনা। আমাদের দেশের প্রধান মন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী সমাজের প্রতিভূ। আমরা পবিত্র সংসদেও পেরেছি নারীদের ক্ষমতায়ন করতে।তাই সংসদে পুরুষদের পাশাপাশি নারী সাংসদদের আসন আলোকিত করতে দেখে গর্বে আমাদের বুক ভরে যায় বৈকি।কিন্তু এবার সংসদে ১ বছর পরে আসা বিরোধীদলীয় নারী সংসদেরা যা করলেন, পরে মহাজোটের সতীর্থরাও যেভাবে সে চক্রে জড়িয়ে গেলেন, তাতে আমরা সচেতন নারী সমাজ ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।একি করলেন আপুমনিরা?আপনারা ভুলে গেলেন কি করে সংসদ দেশের সর্বোচ্চ পবিত্র একটি প্রতিষ্ঠান। যদিও আপনাদের অনেকেই সংরক্ষিত মহিলা আসনে আসীন হয়েছেন, কিন্তু তবু যোগ্যতার মাপকাঠিতো একটা সেখানেও ছিল।আমাকে তো নেয়নি। আপনাদের নিয়েছে, কারন আপনারা অধিকতর যোগ্য, তাই পবিত্র সংসদের একজন সাংসদ হিসেবে অপানরা শপথ বাক্য পাঠ করেছেন জনগণের সেবা করবেন বলে। আপনাদের মনে রাগ-দু:খ-কষ্ট থাকতেই পারে,তবে সেটা প্রকাশের স্থান-কাল-পাত্র ভেদে অবশ্যই সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।আপনারা আপনাদের চার দেয়ালের মধ্যে অহেতুক চেঁচামেচি করতে পারেন , সহেতুকও পারেন। কাজের মেয়েকে ধরে মারধরও করতে পারেন।কিন্তু আপনাদের জনসমক্ষে অবশ্যই মাত্রাজ্ঞান সম্পন্না হতে হবে।আর সংসদে তো বটেই, সেখানে আপনারা আপনাদের ক্ষোভ, আপনাদের অনুযোগ বা অভিযোগ উথ্থাপন অবশ্যই করতে পারেন,সে অধিকার আপনাদের আছে। কিন্তু আপনারা এমন কিছু বলতে পারেননা, এমন কোন আচরণ প্রদর্শন করতে পারেননা, যা দেখে একজন অশিক্ষিত নারী পর্যন্ত লজ্জায় মুখ ঢাকে। এমন কথাও শোনা গেছে, সেদিনের সে বাক্যালাপ নাকি নিষিদ্ধ পল্লীকেও হার মানিয়েছে! একি করলেন আপুমণিরা,আমাদের সব অর্জনকে এভাবে গ্লাণিময় করে তুললেন?
দীর্ঘ ১ বছর পর বাংলাদেশের পবিত্র সংসদে বিরোধী দলের পদধুলি পড়েছিল। খুব জানতে ইচ্ছে করে যখন দুটো দলের দৃষ্টি বিনিময় হল, কুশল জিজ্ঞেস করেছিলেন কি?যাকে ভদ্রতা বলে? নিশ্চয়ই করেননি। শ্রবনীয় দূরত্বে আসা মাত্রই বাক্যবান বর্ষিত হতে লাগল দুদিক থেকেই। সেকি তীক্ষ্মতা সে দৃষ্টি বানের, সে শব্দবানের! বাকপটু অনেক পুরুষ সাংসদ সেদিন সেইক্ষনে সংসদে উপস্থিত ছিলেন।ঘটনার আকস্মিকতায় তারাও বাকরহিত হয়ে গিয়েছিলেন। মাননীয় স্পীকার টেবিল চাপড়ে দু-পক্ষকেই থামতে বলেছিলেন। কিন্তু রসালাপ তখন তুঙ্গে উঠে গেছে, কে কার কথা শোনে? কোলের সংকীর্তন চলছে তখন মহাসমারোহে।একপর্যায়ে এমনভাবে তেড়ে আসলেন তারা পরস্পরের দিকে যেন চুলোচুলি বাঁধে আরকি!তরিৎ গতিতে মাননীয় হুইপ আ.স.ম. ফিরোজ সাহেব ও অন্যান্য সাংসদ এগিয়ে পরিস্থিতি সামাল না দিলে কি যে হত , তা ভাবতেও তীব্র অস্বস্থি হচ্ছে।
মহান সাংসদদের কেচ্ছা বলে কথা! সাথে সাথে মিডিয়া গুলো লুফে নিল সেই মহারণের অনুপম দৃশ্য!তারপর নানারঙে সাজিয়ে ছেড়ে দিল জনসমুদ্রে। নিন্দার ঝড় উঠল দেশ জুড়্ ।েহেন লোক নেই যে বলে নাই কাজটা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক হয়েছে। সেদিনের বিশ্বকাপের ফাইনালের মতই সরব হয়েছিল স্বদেশ, তবে স্তুতিতে নয়, ধিক্কারে। নিন্দার রেশ কাটতে না কাটতেই পুরুষজাতি যেন হঠাৎই জেগে উঠল আর বিচার-বিশ্লেষন করতে লাগল আদাজল খেয়ে। তারা দেখল যারা সেদিন সংসদকে হাস্যকর মজলিশে পরিনত করেছিল, তারা সবাই নারী। যারা বহুকাল আগে অবরোধবাসিনী ছিল। ছিল শিক্ষাদীক্ষাহীন অবলা জীব হিসিবে। ঘরকন্নাতেই জীবনের শুরু এবং শেষ ছিল তাদের।সূর্যের মুখ দেখাও যেন ছিল পাপ।ঘরে বসে যদি তারা চুলোচুলিও করতো, বাইরে পৃথিবী ঘূণাক্ষরেও জানতে পারতোনা। পুরুষরা এ পর্যন্ত এসে ভাবতে শুরু করল সেইতো ছিল ভাল। তারা আড়েঠাড়ে এও বুঝিয়ে দিল, যাদের যেখানে মানায়,সেখানে থাকাইতো ভাল,যেন বলতে চাইল বন্যেরা বনে সুন্দর,নারীরা রান্নাঘরে। আর কিছুনা হোক তাদের রসনাতো তৃপ্ত হবে। হায় আপুমণিরা, কত কষ্ট করে আমরা নারীরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে চলেছি, এখনও পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে উঠতে পারিনি,এখনও মেয়ে শিশু প্রতিনিয়ত অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে এদেশে, এখনও এদেশে মেয়েদের শিক্ষালাভে নিরুৎসাহিত করা হয়, কিছু বুঝে ওঠার আগেই সংসারে ঢুকিয়ে দেয়া হয় ঘরকন্নার কাজে। এখনও নারী শ্রমিকদের মজুরী কম দেয়া হয় পুরুষদের চেয়ে। হিন্দু নারীদের এখনও সম্পত্তিতে অধিকার বর্তায়নি। যৌন হয়রানি , এসিড দগ্ধ হয়ে এখনও কোমলমতি কিশোর-তরুনীরা অকালে ঝরে যাচ্ছে এই সুন্দর পৃথিবী থেকে। এতসব প্রতিকুল পরিবেশ পেরিয়ে পবিত্র সংসদে প্রবেশাধিকার পেয়েও তার অমর্যাদা করলেন?ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের যে তীর আপনাদের মুখ থেকে ছুটে গেছে, তাকে তো আর ফেরানো যাবেনা , ঘুচানো যাবেনা চেপে বসা অপবাদ। তবু আশা করব, ভবিষ॥তে আপনারা আপনাদের সম্মান বজায় রেখে কথাবার্তা বলবেন,চলাফেরা করবেন। কারন অনেক কষ্টে আমরা অবরোধ ভেঙে অন্ধকার কারা কক্ষ থেকে আলোর জগতে পা ফেলেছি। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পরিবার থেকে শুরু করে পুরো নারী সমাজটাকেই আমরা এগিয়ে নিয়ে চলেছি আলোর পথে।যারফলে পুরুষেরা আজ মানতে বাধ্য হয়েছে আমাদের জ্ঞান-গরিমাও কম কিছু নয় তাদের চেয়ে। তাই অনুরোধ আপনাদের কাছে, আমাদের এ অর্জনকে ম্লান করে দেবেননা। (লেখক ঃ প্রভাষক,প্রাণিবিদ্যা, বাউফল কলেজ, বাউফল, পটুয়াখালী)

Advertisements

About মোঃ আবুল বাশার

আমি একজন ছাত্র,আমি লেখাপড়ার মাঝে মাঝে একটা ছোট্ট প্রত্রিকা অফিসে কম্পিউটার অপরেটর হিসাবে কাজ করে,নিজের হাত খরচ চালানোর চেষ্টা করি, আমি চাই ডিজিটাল বাংলাদেশ হলে এবং তাতে সেই সময়ের সাথে যেন আমিও কিছু শিখতে পারি। আপনারা সকলে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পরার চেষ্টা করি এবং অন্যকেও ৫ওয়াক্ত নামাজ পরার পরামর্শ দিন। আমার পোষ্ট গুলো গুরে দেখার জন্য ধন্যবাদ, ভাল লাগেলে কমেন্ট করুন। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে,ভুল ত্রুটি,হাসি,কান্না,দু:খ,সুখ,এসব নিয়েই মানুষের জীবন। ভুলে ভড়া জীবনে ভুল হওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়,ভুল ত্রুটি ক্ষামার দৃর্ষ্টিতে দেখবেন। আবার আসবেন।

Posted on 05/04/2012, in লেখাপড়া / শিক্ষা, News and tagged . Bookmark the permalink. এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান.

পোষ্টটি আপনার কেমন লেগেছে? মন্তব্য করে জানান।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: