শাবান মাসের মর্যাদা


মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

রাসূল সা: রজব মাসে দোয়া করতেন : অর্থ : ‘হে আল্লাহ আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করে দিন। আর আমাদেরকে রমজান পাওয়ার তাওফিক দিন।’ শাবান মাসে তিনি অনেক নফল রোয়া রাখতেন। আয়েশা রা: বর্ণনা করেন : ‘আমি প্রিয় নবী সা:-কে রমজান মাস ছাড়া আর কোনো পূর্ণ মাসে রোজা রাখতে দেখিনি। আর শাবান মাস ছাড়া আর কোনো মাসে এত অধিক পরিমাণ নফল রোজা রাখতে দেখিনি’ (বোখারি ও মুসলিম)। সাহাবি উসামা বিন জায়েদ রা: বর্ণনা করেন : আমি প্রিয় নবীজী সা:-কে জিজ্ঞেস করলাম : ইয়া রাসূলুল্লাহ সা:, শাবান মাসে আপনি যত নফল রোজা রাখেন, অন্য কোনো মাসে আপনাকে এত নফল রোজা রাখতে দেখি না। প্রিয় নবীজী সা: এরশাদ করলেন : রজব ও রমজান, এ দুটো মাসের মাঝখানের এ মাসটি সম্পর্কে অনেকেই আসলে গাফেল হয়ে থাকেন। এ মাসে মানুষের আমলের (বার্ষিক রিপোর্ট) আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আমি চাই আমার আমল যখন পেশ করা হয়, আমি যেন তখন রোজার হালতে থাকি। (আবু দাউদ, নাসায়ি, ইবনে খোজাইমা)।
প্রত্যেক মুসলমানই অবগত আছেন ইসলামী শরিয়তের মূল উৎস দু’টি কুরআন ও হাদিস। কুরআন ও হাদিসে যে ইবাদতের যতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তার চেয়ে একটু বেশি বা কম গুরুত্ব দেয়ার কোনো অধিকার কোনো মুসলিমের নেই। শবেবরাত নামক বিষয়টি কুরআনুল কারিমে আদৌ উল্লেখ করা হয়নি। এটাই হচ্ছে উম্মতের মুহাকিক আলিম ও ইমামদের মতামত। কেউ কেউ দাবি করে থাকেন, সূরা আদ্-দোখানে ‘লাইলাতুম্ মুবারাকাহ’Ñ বরকতময় রাত বলতে শবেবরাতকেই বোঝানো হয়েছে।
ইমাম ইবনে কাছির রা: বলেন, বরকতময় রাত বলতে সূরা দোখানে শবেকদরকে বোঝানো হয়েছে। কারণ এখানে কুরআন নাজিলের কথা বলা হয়েছে। আর সেটা তো সূরা কদরে স্পষ্ট করেই বলা আছে। আর কুরআন রমজান মাসেই নাজিল হয়েছে, সেটাও সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে সূরা বাকারায়। তিনি আরো বলেন, কেউ যদি বলে, বরকতময় রাত বলতে মধ্য শাবানের রাত বোঝানো হয়েছে, যেমনটি ইকরিমা কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, তাহলে সে প্রকৃত সত্য থেকে অনেক দূরে অবস্থান করল।
শবেবরাতে মানুষের হায়াত, মাউত ও রিজিকের বার্ষিক ফায়সালা হওয়াসংক্রান্ত যে হাদিসটি উসমান বিন মুহাম্মদ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি বলেছেন, হাদিসটি মুরসাল। অর্থাৎ হাদিসের প্রথম বর্ণনাকারী হিসেবে যে সাহাবি রাসূলুল্লাহ সা: থেকে হাদিসটি শুনেছেন তার কোনো উল্লেখ নেই। ফলে এমন দুর্বল হাদিস দিয়ে কুরআন ও সহিহ হাদীসের অকাট্য বক্তব্যকে খণ্ডন করা যায় না। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন তাফসির ইবনে কাছির, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩১৬১)।
ইমাম কুরতুবি বলেন, বরকতময় রাত্রি বলতে কদরের রাতকে বোঝানো হয়েছে। যদিও কেউ বা বলেছেন সেটা হচ্ছে মধ্য শাবানের রাত। ইকরিমাও বলেছেন সেটি হচ্ছে মধ্য শাবানের রাত। তবে, প্রথম মতটি অধিকতর শুদ্ধ। কেননা, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আমি এ কুরআনকে লাইলাতুল কদরে নাজিল করেছি। এ প্রসঙ্গে মানুষের হায়াত, মাউত, রিজিক ইত্যাদির ফায়সালা শবেবরাতে সম্পন্ন করা হয় বলে যে রেওয়ায়েত এসেছে, সেটাকে তিনি অগ্রহণযোগ্য বলে বর্ণনা করেন। তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন, সহিহ শুদ্ধ কথা হচ্ছেÑ এ রাতটি লাইলাতুল কদর।
অতঃপর তিনি প্রখ্যাত ফকিহ কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবির উদ্ধৃতি পেশ করেন, ‘জমহুর আলিমদের মতামত হচ্ছেÑ এ রাতটি লাইলাতুল কদর। কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন এটা মধ্য শাবানের রাত। এ কথাটি একেবারেই বাতিল। কারণ আল্লাহ তাঁর অকাট্য বাণী কুরআনে বলেছেন, রমজান হচ্ছে ওই মাস, যে মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে। যেথায় তিনি মাস উল্লেখ করে দিয়েছেন। আর বরকতময় রাত বলে লাইলাতুল কদরকে উল্লেখ করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ রাতটাকে রমজান থেকে সরিয়ে অন্য মাসে নিয়ে যায়, সে মূলত আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে বসে। মধ্য শাবানের রাতটির ফজিলত এবং এ রাতে হায়াত, মাউতের ফায়সালাসংক্রান্ত কোনো একটি হাদিসও সহিহ এবং নির্ভরযোগ্য নয়। কাজেই কেউ যেন সেগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত না করে। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : তাফসিরে কুরতুবি ষোড়শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৬-১২৮)। ইমাম তাবারি তাফসিরে তাবারিতে বরকতময় রাতের তাফসিরে উল্লেখ করেন : কাতাদাহ রা: বর্ণিত এ রাতটি লাইলাতুল কদরের রাত। প্রতি বছরের শাবানের মতামতটিও উল্লেখ করেন। পরিশেষে তিনি মন্তব্য করেন : লাইলাতুল কদরের মতটিই শুদ্ধ ও সহিহ। কারণ এখানে কুরআন নাজিলের কথা বলা হয়েছে। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : তাফসিরে তাবারি ১১ খণ্ড, পৃষ্ঠা : ২২১-২২৩)।
আল্লামা মুহাম্মদ আল আমিন আশ শিনকিতি রা: সূরা দোখানের বরকতময় রাতের তাফসিরে বলেন, এটি হচ্ছে রমজান মাসের কদরের রাত। মধ্য শাবানের রাত হিসেবে সেটিকে বোঝানো হয়েছে মনে করা, যেমনটি ইকরিমা কর্তৃক বর্ণিত রেওয়াতে বলা হয়েছে, একটি মিথ্যা দাবি ছাড়া আর কিছু নয়। কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধী এ দাবিটি নিঃসন্দেহে হকের বিপরীত যেকোনো কথাই বাতিল। কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধী যে হাদিসগুলো কেউ কেউ বর্ণনা করে থাকেন, যাতে বলা হয় এ রাতটি হচ্ছে মধ্য শাবানের রাত, সে হাদিসগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। সেগুলোর কোনোটার সনদই সহিহ নয়। ইবনুল আরাবিসহ অনেক মুহাকিক আইম্মায়ে কেরাম এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে বলেছেন, বড়ই আফসোস ওই মুসলমানদের জন্য যারা কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধিতা করে কুরআন বা সহিহ হাদিসের দলিল ছাড়াই। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : আদওয়াউল বায়ান, সপ্তম খণ্ড, পৃ: ৩১৯)।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মুফতি শফি র: এ বিষয়ে মাআরেফুল কুরআনে বলেন, বরকতময় রাত বলতে বেশির ভাগ তাফসিরবিদের মতে এখানে শবেকদর বোঝানো হয়েছে যা রমজান মাসের শেষ দশকে হয়। কেউ কেউ আলোচ্য আয়াতে বরকতের রাত্রির অর্থ দিয়েছেন শবেবরাত। কিন্তু এটা শুদ্ধ নয়। কেননা, এখানে সর্বাগ্রে কুরআন অবতরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর কুরআন যে রমজান মাসে নাজিল হয়েছে, তা কুরআনের বর্ণনা দ্বারাই প্রমাণিত। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : মাআরিফুল কুরআন, পৃষ্ঠা : ১২৩৫)।
কুরআন দিয়েই কুরআনের তাফসির গ্রহণ করার সুযোগ থাকলে সেটাই গ্রহণ করতে হবে। এটাই ওলামায়ে উম্মতের এজমাহ। শবেবরাত সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসগুলো দুই প্রকার : প্রথমত. শবেবরাতে কত রাকাত নামাজ পড়তে হবে, সূরা এখলাস, আয়াতুল কুরসি প্রতি রাকাতে কতবার পড়তে হবে ইত্যাদি এবং সে আমলগুলোর বিস্তারিত ছওয়াবের ফিরিস্তিসংক্রান্ত হাদিসগুলো একেবারেই জাল এবং বানোয়াট। আর দ্বিতীয় প্রকার হাদিস হলোÑ এ রাতের ফজিলত, ইবাদতের গুরুত্ব ইত্যাদি বিষয়ে। এসব হাদিসের কোনোটাই সহিহ হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। বরং সবই জয়িফ (দুর্বল)। তবে সবই মাউজু (জাল বা বানোয়াট নয়)।
শবেবরাতসংক্রান্ত কোনো একটি হাদিসও বুখারি ও মুসলিম গ্রন্থদ্বয়ে আসেনি। আর বাকি চারটি গ্রন্থে বা অন্যান্য আরো কিছু গ্রন্থে এসংক্রান্ত যে হাদিসগুলো এসেছে, তার একটিও সহিহ হাদিসের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। হাদিস বিশারদদের মন্তব্যসহকারে শবেবরাতসংক্রান্ত কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হলো : ১) আলী রা:-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা: এরশাদ করেছেন, ১৫ শাবানের রাতে তোমরা বেশি বেশি করে ইবাদত করো এবং দিনের বেলায় রোজা রাখো। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা সূর্যাস্তের সাথে সাথেই দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। বলতে থাকেন : ‘কে আছো আমার কাছে গুনাহ মাফ চাইতে। আমি তাকে মাফ করতে প্রস্তুত। কে আছো রিজিক চাইতে! আমি তাকে রিজিক দিতে প্রস্তুত। কে আছো বিপদগ্রস্ত! আমি তাকে বিপন্মুক্ত করতে প্রস্তুত। কে আছো… এভাবে (বিভিন্ন প্রয়োজনের নাম নিয়ে) ডাকা হতে থাকে সুবহে সাদেক পর্যন্ত।’ ইবনে মাজাহ কর্তৃক হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে।
এ হাদিসটি যে আদৌ সহিহ নয় সে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম হাফেজ শিহাবুদ্দিন যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হাদিসটির সনদ জয়িফ (দুর্বল)। কারণ অনির্ভরযোগ্য।
২) আয়েশা রা: বরাতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমি এক রাতে দেখতে পাই, রাসূলুল্লাহ সা: আমার পাশে নেই। আমি তাঁর সন্ধানে বের হলাম। দেখি, তিনি জান্নাতুল বাকি (কবরস্থানে) অবস্থান করছেন। ঊর্ধ্বাকাশের দিকে তাঁর মন্তক ফেরানো। আমাকে দেখে বললেন, আয়েশা, তুমি কি আশঙ্কা করেছিলে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা: তোমার প্রতি অবিচার করছেন। আয়েশা রা: বললেন, এমন ধারণা করিনি, তবে মনে করেছিলাম, আপনি অন্য কোনো বিবির সান্নিধ্যে গিয়েছিলেন কি না! রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, আল্লাহ তায়ালা ১৫ শাবানের রাতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং কালব গোত্রের সমুদয় বকরির সব পশমের পরিমাণ মানুষকে মাফ করে দেন। (তিরমিজি, ইবানে মাজাহ)। ইমাম তিরমিজি হাদিসটি বর্ণনা করে নিজেই মন্তব্য করেছেন, আয়েশা রা: বর্ণিত এ হাদিসটি হাজ্জাজ বিন আরতাআহ্ ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেছেন বলে জানা নেই।
ইমাম বোখারি বলেছেন, এ হাদিসটি জয়িফ (দুর্বল)। হাজ্জাজ বিন আরতাআহ্ বর্ণনা করেছেন ইয়াহ্ইয়া বিন আবি কাছির থেকে। অথচ হাজ্জাজ ইয়াহ্ইয়া থেকে আদৌ হাদিস শোনেননি। ইমাম বোখারি আরো বলেছেন, এমনকি ইয়াহ্ইয়া বিন আবি কাছিরও ওরওয়া থেকে আদৌ কোনো হাদিস শোনেননি। (দেখুন জামে তিরমিজি, ছাওম অধ্যায়, মধ্য শাবানের রাত, পৃ: ১৬৫-১৬৮)।
৩) আবু মুছা আশআরি রা: থেকে বর্ণিত : রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ১৫ শাবানের রাতে আল্লাহ তায়ালা নিচে নেমে আসেন, বরং সব মাখলুককেই মাফ করে দেন। তবে মুশরিক এবং মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টিকারীকে মাফ করেন না (ইবনে মাজাহ)। এ হাদিসটির ব্যাপারে হাফেজ শিহাবুদ্দীন তার যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, এর সনদ জইফ (দুর্বল)। একজন রাবি (বর্ণনাকারী) আবদুল্লাহ বিন লাহইয়াআহ নির্ভরযোগ্য নন। আরেকজন রাবি ওয়ালিদ বিন মুসলিম তাদলিছকারী (সনদের মধ্যে হেরফের করতে অভ্যস্ত) হিসেবে পরিচিত। শবেবরাতে আমল করা যেতে পারে অনেক ওলামায়ে কেরাম এমন মতামত দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন আসে, আমল করতে হলে কিভাবে করা যাবে।
প্রথমত, ব্যক্তিগতভাবে কিছু ইবাদত বন্দেগি করা যেতে পারে। সে জন্য মসজিদে সমবেত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করার জন্য ওয়াজ, নসিহত, জিকির ইত্যাদির আয়োজন করা যাবে না (দেখুন : ফাতাওয়া শামিয়া, ইমাম বিন আবেদীন, পৃ: ৬৪২)।
দ্বিতীয়ত, হায়াত, মাউত, রিজিক ইত্যাদির ফায়সালা এ রাতে হয়, এটা বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ, এসব ফায়সালা লাইলাতুল কদরে হয়, তা সুস্পষ্টভাবে কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
তৃতীয়ত, আমাদের দেশে আলোকসজ্জা ও আতশবাজির যে তামাশা করা হয়, তা সুস্পষ্ট বিদ্আত। সে ধারণা থেকেই কোনো কোনো এলাকায় এ রাতের নাম হচ্ছে বাতির রাত। এসব ধারণা ইসলামী শরিয়তে হিন্দুদের দিওয়ালি অনুষ্ঠান থেকে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা আশরাফ আলী থানভি র:। হালুয়া-রুটি বিলিবণ্টনের কার্যক্রমও বিদআত (দেখুন : ফাতওয়া শামিয়া, ইমাম বিন আবেদীন পৃ : ৬৪২)।
চতুর্থত, নফল ইবাদতের জন্য সারারাত মসজিদে এসে জেগে থাকা রাসূল সা:-এর সুন্নাতবিরোধী। তিনি নফল ইবাদত ঘরে করতে এবং ফরজ নামাজ জামায়াতের সাথে মসজিদে আদায় করতে তাগিদ করেছেন। আর সারারাত জেগে ইবাদত করাটাও সুন্নাতবিরোধী। প্রিয় নবীজী সা: সব রাতেই কিছু অংশ ইবাদত করতেন, আর কিছু অংশ ঘুমাতেন। তাঁর জীবনে এমন কোনো রাতের খবর পাওয়া যায় না, যাতে তিনি একদম না ঘুমিয়ে সারারাত জেগে ইবাদত করেছেন।
পঞ্চমত, শবেবরাতের দিনের বেলায় রোজা রাখার হাদিস একেবারেই দুর্বল। এর ভিত্তিতে আমল করা যায় না বলে পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলেম ও ফকিহ মুফতি মাওলানা তাকি উসমানী সাহেবের সুস্পষ্ট ফতোওয়া রয়েছে।
ষষ্ঠত, শবেবরাতের রোজার পক্ষে যেহেতু কোনো মজবুত দলিল নেই, তাই যারা নফল রোজা রাখতে চান, তারা আইয়ামে বিজের তিনটি রোজা ১৩, ১৪ ও ১৫ রাখতে পারেন। এর পক্ষে সহিহ হাদিসের দলিল রয়েছে। শুধু একটি না রেখে এ তিনটি বা তার চেয়েও বেশি রোজা রাখতে পারলে আরো ভালো। কারণ, শাবান মাসে রাসূলুল্লাহ সা: সবচেয়ে বেশি পরিমাণ নফল রোজা রেখেছেন।
লেখক : শিক্ষক, প্রবন্ধকার

 

আজ ছিল চন্দ্রমাসের ১৪ই শাবান । চন্দ্রতারিখ অনুযায়ী ১৪ই শাবান দিবাগত রাত শবে বরাত আমাদের দেশে এই শবেবরাতকে এক পূণ্যরজনী হিসাবে আখ্যায়িত করা হয় । পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এ রাতটা মুসলমানরা মহাপূণ্যময় রজনী হিসাবে বরণ করে ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত হয় । মুসলমানরা এ রজনীটিকে আগামী এক বৎসরের ভাগ্য নির্ধারণী রাত হিসাবে মেনে নিয়ে তাদের প্রতিপালকের কাছে উত্তম ভাগ্য নির্ধারণ ও তাঁর সন্তুষ্টি অরজনের জন্য রাতভর প্রার্থনায় রত থাকেন । কিন্তু আমরা এমন একটা দেশে অবস্থান করছি , না আমি কোন অমুসলীম দেশের কথা বলছিনা । আমি বলছি ইসলামের মুলকেন্দ্রস্থল মদিনা মুনাওয়ারার মসজিদে নববীর কথা । এখানে ইসলামের বড় দু’টি দিন ছাড়া অন্য কোন দিন বিশেষ ভাবে পালন করা হয় না । এখানে শবেবরাত , শবেক্বদরের রাত বলে কোন বিশেষ দিন নেই । এখানে না মহররম , না আছে মি’রাজ আর না আছে ঈদে মিলাদুন্নবী । এখানে আছে শুধু মুসলমানদের দু’টি বড়দিন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। আমি বুঝিনা আমাদের দেশগুলোতে এ দু’টি দিন ছাড়া হাজার হাজার পালনীয় দিন কিভাবে নির্ধারণ করে নিয়েছে । কয়েকদিন আগে আমি একটা নোট পোষ্ট করেছিলাম , যা ছিল ঈদে মিলাদুননবী নিয়ে । এঈ ঈদে মিলাদুন্নবীর উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে গিয়ে শত শত ইন্টারনেট সাইট ঘেঁটে যা পেলাম তাতে চক্ষু ছানাবড়া । ঈদে মিলাদুন্নবী নামে আমরা যে অনুষ্টানটা পালন করি সেটার উৎপত্তির মূলে ছিল ইসলামের একটি বিতর্কিত দল এবং খ্রীষ্টানদের দেখানো একটা পথের অনুস্মরণ । যা রাসুল (সাঃ), রাসূল (সাঃ) এর প্রকৃত ও পরীক্ষিত ভালোবাসার বন্ধু এবং একনিষ্ট সহচর সাহাবাগণ , তৎপরবর্তী তাবেয়ী , তাবে তাবেয়ীগণ কর্তৃক অনুমুদিত নয় ।

আজ শবেবরাত পালন করতে গিয়ে আমাদের দেশের কথা মনে করে মনে হলো শবেবরাতের আয়োজন ও ঈদে মিলাদুন্নবীর মত নয় তো ? যদি না হয় , এখানে শবেবরাত পালন হয় না কেন ? আমাদের দেশের মুসলীম আর এদেশের মুসলীমদের মধ্যে এতটা ব্যবধান কেন ? তবে কি আমাদের দেশের আলেমরা আমাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে যাচ্ছেন , নাকি এদেশের আলেমরা ইসলাম সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে যাচ্ছেন ? কোন আলেমদের তথ্যকে আমরা সঠিক ভাববো – এদেশের নকি আমাদের দেশের আলেমদের ? আমরা সাধারণ মুসলমানরা আল্লাহর পথে যতে হলে কোনদিকে ধাবমান হব ? কেন মুসলমানদের মধ্যে এত বিভক্তি? সাধারণ মুসলমানরা কিভাবে বুঝবে কোনটা আল্লাহর পথ ? এভাবে দুইদিকের আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে যদি সাধারণ মুসলমানরা আল্লাহভক্তির পরিবর্তে আল্লাহকে বিভক্ত করে ফেলে , তবে সে দায়দায়িত্ব কে নিবে ? আমাদের দেশের আলেমরা নাকি এদেশের আলেমরা ? এভাবেই অনেক প্রশ্ন এসে ভীড় করে মনের কোণে । কেন আলেমদের মাঝে এত বিভক্তি ?

যা হোক এ লেখা লিখে কোন ফায়দা নেই । কারণ আলেমরা আলেমদের মতই থাকবে । এ বিভক্ত নিরসনে তারা কোন পদক্ষেপ নিবেনা । কারণ তারা জানে পদক্ষেপ নিতে গেলেই তাদের পেঠপূঁজা বন্ধ হয়ে যাবে । এক এক আলেম এক এক স্থান দখল করে তাদের পেঠ পূঁজা করে যাচ্ছে । সাধারণ মানুষদের আল্লাহর পথ দেখানোর নামে তাদের বোকা বানিয়ে করে যাচ্ছে তারা নিজ নিজ পেঠপূঁজা। প্রকৃত পক্ষে তারা নিজেরাও জানেনা আল্লাহকে পাওয়ার পথ কোনটি , আল্লাহর নিকটবর্তী হবার পথ কোনটা ? নয়তো কেন আল্লাহকে পাওয়ার একটি মাত্র রাস্তার মধ্যে এত বিভক্তি ?

সে যাক, আর বিশেষ কিছু বলতে চাইনা । মসজিদে নববীতে মাগরীব ও এশার নামাজ শেষ করে এলাম কিছুক্ষণ আগে । যখন দেখলাম আমাদের দেশের মতো এখানে কেহই শবেবরাত পালন করেনা , তখন কিছুটা মনের অনুভুতি শেয়ার করনে এই লেখা । জানি আলেমরা এ লেখা পড়বেনা , পৌঁছবেনা তাদের কাছে আমার মনের কথা । তবুও কামনা করি প্রত্যেক আলেম একই পথের পথিক হোক , এক রাসুল (সাঃ) আর এক আল্লাহ , এক কোরআন আর এক হাদীস এই দু’টি অবলম্বন করেই বিশ্বের সকল আলেম একই রাস্তায় উপণিত হয়ে সাধারণ মুসলীমদের এক আল্লাহর পথে ধাবিত করুক – এটাই হলো শেষ প্রত্যাশা।

Advertisements

About মোঃ আবুল বাশার

আমি একজন ছাত্র,আমি লেখাপড়ার মাঝে মাঝে একটা ছোট্ট প্রত্রিকা অফিসে কম্পিউটার অপরেটর হিসাবে কাজ করে,নিজের হাত খরচ চালানোর চেষ্টা করি, আমি চাই ডিজিটাল বাংলাদেশ হলে এবং তাতে সেই সময়ের সাথে যেন আমিও কিছু শিখতে পারি। আপনারা সকলে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পরার চেষ্টা করি এবং অন্যকেও ৫ওয়াক্ত নামাজ পরার পরামর্শ দিন। আমার পোষ্ট গুলো গুরে দেখার জন্য ধন্যবাদ, ভাল লাগেলে কমেন্ট করুন। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে,ভুল ত্রুটি,হাসি,কান্না,দু:খ,সুখ,এসব নিয়েই মানুষের জীবন। ভুলে ভড়া জীবনে ভুল হওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়,ভুল ত্রুটি ক্ষামার দৃর্ষ্টিতে দেখবেন। আবার আসবেন।

Posted on 05/07/2012, in Islamic and tagged , , , . Bookmark the permalink. এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান.

পোষ্টটি আপনার কেমন লেগেছে? মন্তব্য করে জানান।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: